১৯

 

আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ পরবর্তী ঘটনা বিকাশের সম্ভাব্য পথ ছিল দুটি: (১) আসন্ন শীতে ভারত-তিব্বত গিরিপথসমূহ তুষারাবৃত হয়ে পড়ার পর ঢাকার উদ্দেশে মিলিত ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযান; অথবা (২) শীতের প্রাক্কালে গিরিপথসমূহ উন্মুক্ত থাকতেই আসন্ন বিপর্যয় প্রতিরোধের জন্য আমেরিকা ও চীনের কৌশলী হস্তক্ষেপের (tactical intervention) উপর ভরসা করে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতাবস্থা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টাএই দুই সম্ভাবনার মধ্যে প্রকৃত ঘটনা কোন্‌ পথে অগ্রসর হতে পারে, তা সুস্পষ্ট ছিল নাতবে কার্যকারিতার দিক থেকে প্রথম সম্ভাবনার সাফল্য উজ্জ্বলতর মনে হয় মূলত দু’টি কারণেপ্রথমত, মুক্তাঞ্চল গঠন প্রতিরোধ করার দীর্ঘ শ্রান্তিকর কাজে পাকিস্তানী বাহিনী সুদীর্ঘ সীমান্ত বরাবর ছড়িয়ে থাকায় তাদের প্রহরার এলাকা সুবিস্তৃত ছিল বটে, কিন্তু তার ফলে বৃহত্তর আক্রমণ প্রতিরোধের গভীরতা সর্বত্রই তাদের লোপ পায়তাদের প্রতিরক্ষার আয়োজন অনেকটা হয়ে ওঠে স্ফীত বেলুনের মত-এর বহিরাবরণ যতই নিরবচ্ছিন্ন দেখাক, এর ভিতরটা ছিল সর্বাংশেই ফাঁপাদ্বিতীয়ত, সকল প্রধান সড়ক ও যোগাযোগ কেন্দ্রে পাকিস্তান প্রতিরক্ষার জন্য যে সব ‘দুর্গ’, ‘মজবুত ঘাঁটি’ প্রভৃতি গড়ে তুলেছিল, সে সব পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কৌশল অবলম্বনের দরুন ঢাকার উদ্দেশে দ্রুত অভিযান পরিচালনা ভারত ও বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয়

 

অবশ্য এক্ষেত্রে আশঙ্কা ছিল এই যে, বাংলাদেশ-ভারতের এই অভিযান দৃষ্টে পাকিস্তান দ্রুত তাদে সৈন্য গুটিয়ে এনে ঢাকা নগরী অবরোধের প্রচেষ্টা চালাতে পারেপাকিস্তানীদের হাতে ঢাকার জনসমষ্টি পণবন্দী (hostage) হিসাবে অবরুদ্ধ হওয়ার পর তাদের মুক্ত করার প্রচেষ্টায় অকল্পনীয় প্রাণহানী এবং বাড়ীঘর ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তো ছিলই তদুপরি পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয় বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল প্রবলএই অবস্থায় চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা অস্পষ্ট হয়ে থাকলেও, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ যে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের প্রত্যাশিত পরাজয়কে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলতে পারে এবং তার ফলে মুক্তিসংগ্রাম যে অধিকতর দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী পর্বে প্রবেশ করতে পারে, সে জাতীয় আশঙ্কা নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ও আমার মধ্যে আলোচিত হয়বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের আশঙ্কা প্রবল বলে গণ্য করলেও আমরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছি যে, ঢাকার চতুষ্পার্শ্বে দ্রুত ব্যূহ রচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিজস্ব সামর্থ্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোন কার্যকর হস্তক্ষেপ সম্ভব নয়ঢাকার বুকে ‘সর্বশেষ লড়াই’ সংঘটনের জন্য কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাকিস্তানের রয়েছে কি না অথবা ঢাকায় ব্যূহ রচনার মত কোন রিজার্ভ সৈন্যের আয়োজন তাদের আছে কি না, তা আমাদের অজ্ঞাত ছিলতৎসত্ত্বেও ঢাকা নগরীর সম্ভাব্য অবরোধ, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ঊর্ধ্বতন ভারতীয় নেতৃত্বের গোচরে আনার বিষয় স্থির হয়

 

বস্তুত নভেম্বরে যুদ্ধের সম্ভাবনা যতই নিকটতর ও স্পষ্টতর হতে থাকে, ততই তার অন্তর্নিহিত সমস্যাবলী অধিকতর মুখ্য ও জরুরী হয়ে উঠতে থাকেফলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যবস্থাপনা ও আক্রমণধারা উন্নত করার জন্য যে সব বিষয় এতদিন অগ্রাধিকার লাভ করে এসেছিল সেগুলির প্রয়োজন হ্রাস পেতে শুরু করে, এমনকি কোন কোন বিষয়ে অর্জিত অগ্রগতি অংশত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েযেমন, পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চার ডিভিশন এবং ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্যের শক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজে বিগত কয়েক মাস ধরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সর্ববৃহৎ হলেও, এই দুই পেশাদার সশস্ত্রবাহিনীর প্রত্যাসন্ন সংঘাতের পটভূমিতে অনিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের, এমনকি বাংলাদেশের নিয়মিত ব্যাটালিয়ানসমূহের ভূমিকা পূর্বাপেক্ষা সীমিত হয়ে পড়েকিন্তু সীমিত ভূমিকার অর্থ গুরুত্বশূন্য ভূমিকা নয়পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযানের মূল দায়িত্ব ভারতীয় কমান্ডের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া সত্ত্বেও শত্রু-অবস্থানের পশ্চাতের তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট কৌশল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামরিক কমান্ডের সহায়ক ভূমিকার প্রভূত প্রয়োজন ছিল

 

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে স্বভাবতই যে উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল, ওসমানী তা থেকে নিজকে বহুলাংশে দূরে সরিয়ে ফেলেন এবং সার্ভিস ম্যানুয়াল রচনার মত এমন সব কাজে নিজকে ব্যস্ত রাখেন যার সঙ্গে প্রত্যাসন্ন চূড়ান্ত অভিযানের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল নাঅক্টোবরের শেষে ওসমানীর আপত্তি সত্ত্বেও যুগ্ম-কমান্ডব্যবস্থা গৃহীত হওয়ার পর থেকে ওসমানীর আচরণে কোন স্পষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা অথবা তাঁর বক্তব্যে গ্রহণযোগ্য বিকল্প রণকৌশলের প্রস্তাব ছিল নাবস্তুত ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে নিয়মিত বাহিনীর তৎপরতার ফলে উদ্ভূত নির্দিষ্ট সমস্যাদি প্রতিবিধানের

জন্য২১৭  তাজউদ্দিন যখন যুগ্ম-কমান্ড গঠনের পক্ষে মনস্থির করেন, তখন এ বিষয়ে কোন বিকল্প প্রস্তাব না করেই যুগ্ম-কমান্ড গঠিত হলে নিজে পদত্যাগ করবেন বলে ওসমানী তাজউদ্দিনকে হুমকি দেনইতিপূর্বে বিভিন্ন আরো কয়েকটি ইস্যুতে ওসমানী এ ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেনকিন্তু এই প্রথমবার তাজউদ্দিন তাঁকে জানান, লিখিতভাবে এই ইচ্ছা ব্যক্ত করলে, তাজউদ্দিন এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবেনঅতঃপর ওসমানী যুগ্ম-কমান্ড অথবা পদত্যাগপত্র সম্পর্কে কোন উচ্চবাচ্য করেননিকিন্তু ভারতীয় সামরিক নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর পূর্বসঞ্চিত বিরূপ ধারণা এরপর থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেএর প্রভাব রণাঙ্গনে নিয়মিত বাহিনীর উপর কতখানি পড়েছিল বলা শক্ত; তবে সেক্টর অপারেশনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমান্ডের ভূমিকা বরাবরই যতটা দুর্বল ও অনিয়মিত ছিল, নভেম্বরেও তার কোন তারতম্য ঘটেনি বলে মনে করা চলেচূড়ান্ত অভিযানের প্রাক্কালে ওসমানীর এহেন ভূমিকার ফলে ভারতীয়দের সঙ্গে গৃহীতব্য তৎপরতা ও কৌশলের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার অনেকখানি তাজউদ্দিনকেই পূরণ করার চেষ্টা করতে হয়এই পরিস্থিতিতে ডেপুটি চীফ-অব-স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম খোন্দকার বিমানবাহিনীভুক্ত অফিসার হলেও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের স্বচ্ছতার দরুন পেশাগত পরামর্শের জন্য আরও বেশী নিয়োজিত হতেন

 

পাকিস্তানের সম্ভাব্য অবরোধ ও ধ্বংসের হাত থেকে ঢাকা নগরীকে রক্ষা করার চিন্তা ছাড়াও অন্য যে একটি উদ্বেগ এ সময় তাজউদ্দিনের জন্য মুখ্য হয়ে ওঠে তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশিত সাফল্যের পর প্রতিহিংসা-হত্যার বিপদ থেকে শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা করারতাজউদ্দিনের আশঙ্কা জন্মেছিল প্রত্যাসন্ন চূড়ান্ত লড়াইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, যদিও বাস্তবক্ষেত্রে আগস্ট মাস থেকে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা উন্নত হওয়ার লক্ষণ ক্রমশ প্রকাশ পেয়ে চলে৩রা আগস্টে ইয়াহিয়া খান যখন ঘোষণা করেন যে দেশদ্রোহিতার অপরাধে শীঘ্রই শেখ মুজিবের বিচার এবং উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা হবে২১৮ তখন শেখ মুজিবের জীবনের নিরাপত্তা কিছুমাত্র রয়েছে বলে মনে করা কঠিন হয়ে পড়ে৫ই আগস্টে সামরিক জান্তার যে তথাকথিত ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশিত হয়, তাতে ‘সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ সংঘটনের মাধ্যমে’ পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রের’ আয়োজন সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়২১৯  ফলে আসন্ন বিচারের রায় কি দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে কার্যত সকল অস্পষ্টতা দূর হয়৭ই আগস্টে আওয়ামী লীগের যে ৭৯ জনের নাম জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ থেকে বাতিল করা হয়, তাদের মধ্যে শেখ মুজিবের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল২২০ ৯ই আগস্ট পাকিস্তান থেকে পুনরায় ঘোষণা করা হয়, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য’ শেখ মুজিবের শীঘ্রই বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার করা হবে২২১ কিন্তু ঐ দিনই অপ্রত্যাশিতভাবে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নয়াদিল্লীর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সময়ের তফাৎ সাড়ে দশ ঘণ্টার মত; ফলে মৈত্রীচুক্তি-সংক্রান্ত ঘোষণার পর ঐ দিনই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কোন ‘দ্রুত ব্যবস্থা’ (summary action) গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য পাকিস্তানকে সতর্ক করে দেয়২২২ ফলে পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী ১১ই আগস্টে লায়ালপুরে বিশেষ সামরিক আদালতে রুদ্ধদ্বার বিচার শুরু হলেও ঐ দিনই তা মুলতবি ঘোষণা করা হয়৭ই সেপ্টেম্বরে যখন পুনরায় বিচার শুরু হয়, তখন শেখ মুজিবের পক্ষ সমর্থনের জন্য এ. কে. ব্রোহী এবং তাঁর তিনজন সহকারী আইনজীবীকে নিযুক্ত থাকতে দেখা যায়২২৩ ২রা অক্টোবরে পাকিস্তানের সামরিক আদালত শেখ মুজিবকে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করে ‘মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ’ করছে বলে একটি কূটনৈতিক সূত্রে প্রকাশ পায়; অবশ্য একই সূত্র থেকে বলা হয় যে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রবর্গকে এই নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে যে সামরিক আদালতের এই রায় কার্যকর করা থেকে তারা বিরত থাকবে২২৪ এই তথ্যের পরোক্ষ সমর্থন পাওয়া যায় ১০ই অক্টোবরে, যখন জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগপন্থীদের পূর্ববর্তী তালিকা ঈষৎ পরিবর্তিতভাবে প্রকাশিত হয়এই তালিকা থেকে শেখ মুজিবের নাম বাদ পড়ে২২৫ অর্থাৎ ‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত’ শেখ মুজিব তাঁর নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ আসনে কার্যত পুনর্বহাল হনঅক্টোবরের শেষে ‘নিউজউইক’ পত্রিকার প্রতিনিধিকে ইয়াহিয়া খান জানান, শেখ মুজিবকে তিনি খেয়ালখুশী মত ছেড়ে দিতে অসমর্থ হলেও, ‘জাতি যদি তাঁর মুক্তি চায়’ তবে ইয়াহিয়া ‘তা পূরণ করবেন’২২৬ পরবর্তীকালে কিসিঞ্জারের বিবরণ থেকেও দেখা যায়, ৩রা নভেম্বরে পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত কিসিঞ্জারকে অবহিত করেন, ‘ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের মনোনীত কোন প্রতিনিধির সাথে আলোচনা করার বিষয় বিবেচনা করতে রাজী আছে২২৭

 

‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ অপরাধে মৃত্যুদণ্ড লাভের সম্ভাবনা থেকে শেখ মুজিবের অবস্থার এই ক্রমোন্নতি পরিলক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশকে মুক্ত করার চূড়ান্ত অভিযান শুরু করার পর পুনরায় তাঁর জীবনাশঙ্কা দেখা দিতে পারে সে সম্পর্কে তাজউদ্দিনের উদ্বেগ ভিত্তিহীন ছিল নাইতিপূর্বে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সচেষ্ট মার্কিন প্রশাসন শেখ মুজিবের প্রাণসংহার থেকে ইয়াহিয়াচক্রকে নিবৃত্ত রাখবে বলে অনুমান করা হলেও,২২৮ পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর সামরিক জান্তাকে শেষ উন্মত্ততা থেকে বিরত রাখা যে সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তার সত্যই অভাব ছিলএই আশঙ্কাবোধ থেকে শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষার নিশ্চিত উপায় উদ্ভাবন নভেম্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে তাজউদ্দিনের অন্যতম প্রধান প্রচেষ্টা হয়ে ওঠে

 

কিন্তু সেই সময় ঢাকা নগরীর ও শেখ মুজিবের জীবনের নিরাপত্তা বিধানের সঙ্গে সামগ্রিক সমর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির যোগসূত্র প্রায় অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠায় এবং মন্ত্রিসভা তখনও অবধি উচ্চ স্তরের সামরিক গোপনীয়তা রক্ষার মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হওয়ায় তাজউদ্দিন প্রায় এককভাবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেনঅক্টোবরের প্রথম থেকে মন্ত্রিসভার কাজকর্মে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় যদিও উন্নত হতে শুরু করে তবু মোশতাক, মাহবুব আলম চাষী প্রভৃতির কার্যকলাপের বিবরণ সম্পর্কে কমবেশী অবহিত হওয়ার পরেও তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে মতপার্থক্যহেতু মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরে তথ্যের নিরাপত্তা তখনও এক গুরুতর সমস্যা ছিলইতিপূর্বে ২৭শে অক্টোবর অপরাহ্ণে কোলকাতায় ৮ থিয়েটার রোড সংলগ্ন লর্ড সিনহা রোডস্থ বিএসএফ ভবনে এক বিশেষ জরুরী ব্রিফিং-এ ডি. পি. ধর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন ও আমাকে মোশতাকচক্র ও মার্কিন প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন দেনদরবারের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যে বিবরণ দান করেন, তাতে অনেক বিষয়ের মধ্যে এ কথাও সুস্পষ্ট হয় যে, মোশতাকের উপস্থিতিতে মুক্তিসংগ্রামের উচ্চতর সামরিক পরামর্শ ও সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রিসভা আদৌ কোন নিরাপদ ফোরাম নয়ঐ দিন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে-আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির মুলতবি বৈঠকের এক ফাঁকে - তাজউদ্দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করেনকিন্তু মোশতাক সম্পর্কে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দোদুল্যমান মনোভাবের ফলে উভয়ের মধ্যে কয়েক-দফা বৈঠকের পর কেবল মাহবুব আলম চাষীর বিরুদ্ধেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের এক অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়মন্ত্রিসভার ভিতরে তথ্যের এই নিরাপত্তার অভাব এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর অভিমানহত আচরণের ফলে নভেম্বরের মাঝামাঝি - পাকিস্তানের সঙ্গে চূড়ান্ত সামরিক বোঝাপড়ার প্রাক্কালে - বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে সকল সামরিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল তার অধিকাংশই তাজউদ্দিন একক দায়িত্বে গ্রহণ করেন২২৯ যদিও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাপারে তিনি মন্ত্রিসভার পূর্ণ সম্মতি এবং দলীয় নেতৃবর্গের মতামত লাভের জন্য সচেষ্ট থাকতেন

 

এই সময়ে অর্থাৎ নভেম্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানী বাহিনীর দখল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার বৃহত্তর লক্ষ্যের অধীনে ঢাকা নগরীকে সম্ভাব্য ধ্বংস থেকে রক্ষা করা, মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ পর্যায়ে পাকিস্তানী প্রতিহিংসা থেকে মুজিবের জীবন রক্ষা করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে আটক বিপন্ন বাঙালীদের মুক্ত করার প্রয়োজন বিশেষ মনোযোগের বিষয়ে পরিণত হয়মুক্তিযুদ্ধের এই তিনটি অধস্তন অথচ অত্যাবশ্যক প্রয়োজন সুনির্দিষ্টভাবে ভারতের বাংলাদেশ-নীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক ডি. পি. ধরের কাছে উপস্থিত করার ফলে এবং ইত্যবসরে পাকিস্তানী বাহিনীর ক্রমবর্ধিত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠার ফলে সরাসরি ঢাকার উদ্দেশে দ্রুত অভিযান চালিয়ে সম্ভাব্য পাকিস্তানী অবরোধ প্রচেষ্টা প্রতিহত করার এবং সে সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে পাক-বাহিনীর সকল পলায়নপথ রুদ্ধ করে পণবন্দী হিসাবে তাদের ব্যবহার করার পক্ষে চিন্তাভাবনা জোরদার হয়১৫ই নভেম্বর দিল্লীতে আমি এই সমুদয় বিষয়ের প্রতি ডি. পি. ধরের দৃষ্টি আকর্ষণের পর লক্ষ্য করি অন্তত রাজনৈতিক পর্যায়ে তাদের চিন্তাও সমমুখীভারতের সামরিক নেতৃত্বও একই লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী হবেন বলে অনুমান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে ঐ সময় তাদের সামরিক পরিকল্পনার রূপান্তর কিভাবে অগ্রসর হয়েছিল সে সম্পর্কে আমাদের যথার্থ ধারণা ছিল নাপরবর্তীকালে প্রকাশিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, অংশত গতানুগতিক অভিযান-পদ্ধতি ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এবং অংশত নদীনালা অতিক্রমের উপযোগী পর্যাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারিং সাজ-সরঞ্জামের অভাবে ভারতের সামরিক নেতৃত্ব শেষ মুহূর্ত অবধি ঢাকাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে উঠতে পারেনি২৩০  সৌভাগ্যবশত বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাকিস্তানীদের পলায়নপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় নৌ-অবরোধ পরিকল্পনা এবং স্থলভূমিতে পাক-বাহিনীর চলাচল ও পুনর্সমাবেশ বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় বিমান তৎপরতার সিদ্ধান্ত যথোচিত সম্পূর্ণতার সঙ্গেই গৃহীত হয়কিন্তু ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনায় ঢাকাকে মুক্ত করার বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তের অভাবহেতু বঙ্গোপসাগরে মার্কিন রণতরীর সমাবেশের পর মুক্তি অভিযান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার যে আশঙ্কা দেখা দেয়, নির্ভেজাল উপমহাদেশীয় রীতিতে পাকিস্তানের বৃহত্তর ভুলের জন্য তার সংশোধনও ঘটেডিসেম্বরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জানা যায়, নভেম্বরের শেষার্ধেও পাকিস্তান ভারতের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে ‘অনবহিত থাকায়’, ঢাকার জন্য আলাদা রিজার্ভের ব্যবস্থা তাদের তো ছিলই না, এমনকি সীমান্ত থেকে সৈন্য গুটিয়ে আনারও কোন পরিকল্পনা তাদের ছিল না২৩১

 

  রাজনৈতিক পর্যায়ে ভারতীয় আশ্বাসের তুলনায় ভারতের সামরিক পরিকল্পনা পিছিয়ে থাকার ফলে ঢাকাকে দ্রুত মুক্ত করা তথা বিজয় সম্পন্ন করার পথে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূরণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বৃহত্তর সামরিক ভুল ছাড়াও আর একটি উপাদান কার্যকর ছিলনভেম্বরে বাংলাদেশের বাইরে ও ভিতরে স্বাধীনতা-সমর্থক প্রায় সকল অবহিতমহল বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মিলিত অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকৃত এলাকার সর্বত্র দীর্ঘ-নির্যাতিত মানুষের বিদ্রোহের শক্তি পুনরায় এমনভাবে প্রজ্বলিত হয়ে উঠবে যে পাকিস্তানের অবশিষ্ট সামরিক ক্ষমতা তাতে সর্বাংশে বিপর্যস্ত না হয়ে পারে নাএই সব আশ্বাস ও বিশ্বাসের ব্যাপার ছাড়াও প্রকাশিত ও সংগৃহীত তথ্য থেকে সে সময়েই জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধিত তৎপরতার ফলে পাকিস্তানী সৈন্যদের নৈশ চলাচল ক্ষমতা ইতিমধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছেরাত্রিতে মুক্তিবাহিনী এবং দিনে সম্ভাব্য ভারতীয় বিমান তৎপরতার ফলে ঢাকা অবরোধের জন্য সীমান্ত থেকে সৈন্য পিছিয়ে আনার পাকিস্তানী প্রয়াস যে অসম্ভব হতে পারে তা অস্পষ্ট ছিল নাএই সব উপলব্ধির উপর নির্ভর করে ক্ষিপ্রগতিতে ঢাকা দখল এবং সমস্ত শত্রুসেনাকে বন্দী করে ফেলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ও অধস্তন লক্ষ্যগুলি একযোগে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে হয়

 

১৬ই নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণক্রমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমদ দিল্লীতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেনএই বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধীর সামপ্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা, বিশেষত বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানীর মনোভাব, অধিকৃত অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা, সীমান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ, কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তানের সম্ভাব্য অভিযান, ভারতের পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়সম্ভবত পূর্ববর্তী বৈঠকের অভিজ্ঞতার ফলে২৩২ এবার চূড়ান্ত অভিযান শুরুর পক্ষে ইন্দিরা গান্ধী কোন অভিমত প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন; ফলে সৈয়দ নজরুল বরং কিছুটা বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়েই এবার কোলকাতা ফিরে আসেনএই সময়ে তাজউদ্দিনকে জানানো হয়, গত দু’মাস যাবৎ তাঁর ও ডি. পি. ধরের মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের বিষয় নিয়ে যে আলোচনা চলে আসছিল তা ভারত সরকার স্থগিত রাখার পক্ষপাতী; কেননা তাদের মতে ভারতে অবস্থানকালে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর ভারতের চাপের মুখেই সম্পন্ন হয়েছে বলে চিত্রিত হওয়া স্বাভাবিক২৩৩  তবে এর ফলে বাংলাদেশকে মুক্ত করার ব্যাপারে ভারতের সর্বাত্মক সহায়তার কোন তারতম্য ঘটবে না, এ প্রতিশ্রুতিও পুনরায় তাজউদ্দিনকে দেওয়া হয়

 

তাজউদ্দিনও চুক্তির ব্যাপারে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে সঠিক হিসাবেই গ্রহণ করেনকেননা পাকিস্তানের দখল অবসানের জন্য যে ভূমিকায় ভারতকে সম্মত করানোর উদ্দেশ্যে তাজউদ্দিন এক সময় এই চুক্তির কথা ভেবেছিলেন, তার সকল আয়োজনই এখন সম্পন্ন-প্রায়দিল্লী থেকে ফিরেই তাজউদ্দিন শত্রুমুক্ত বাংলাদেশের জন্য বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা, শরণার্থী প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন, জরুরী পণ্য সরবরাহ, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রভৃতি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত কর্মসূচী জরুরীভিত্তিতে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা সেল ও সকল প্রশাসনিক বিভাগকে তৎপর করে তোলেনঅবশ্য কোন কোন দফতর নভেম্বরের প্রথম থেকেই শত্রুমুক্ত বাংলাদেশের জন্য তাদের বিভাগীয় কর্মসূচী প্রণয়ন শুরু করেনপরিকল্পনা সেল যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ শুরু করেন তারও অন্তত একমাস আগে

 

তাজউদ্দিন দিল্লী থেকে ফিরে আসার দু’দিন বাদে ডি. পি. ধর কোলকাতা এসে পৌঁছান উপমহাদেশের দ্রুত ধাবমান ঘটনা পটভূমিতে, বিভিন্ন অসমাপ্ত আলোচনাকে সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে এবং সম্ভবত সামগ্রিক আয়োজনের চূড়ান্তকরণ তদারক করার উদ্দেশ্যেআমাদের দিক থেকে বহুবিধ জটিল সমস্যার মধ্যে একটি প্রধান সমস্যা ছিল সরবরাহকৃত অস্ত্র পুনরুদ্ধার-সংক্রান্তযে সব মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল-এবং পাকিস্তান যাদেরকে অস্ত্র দিয়েছিল - তাদের কাছে থেকে প্রত্যাসন্ন বিজয়ের পর অস্ত্র পুনরুদ্ধার করার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণএ বিষয়ে আলোচনাধীন একটি খসড়া প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট আরো কতিপয় বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিযুক্ত করেন১৯ থেকে ২১শে নভেম্বরের মধ্যে ডি. পি. ধরের সঙ্গে আমার মোট চার-দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়এর মধ্যে দীর্ঘতম বৈঠক ছিল ১৯শে নভেম্বর এবং এই দিনের আলোচিত বিষয় সম্পর্কে আমার রাখা সংক্ষিপ্ত নোট ছিল:

 

“Meeting took place at 9 pm at Grand Hotel. DP, (Indian) Defence Secretary K. B. Lal and MH discussed about: (1) the nature of the political problem after liberation; (2) the arrangement for disarming the FF (and other armed elements); (3) the minimum and maximum time-frame for Indian Army to remain in Bangladesh after liberation; and (4) the possibility of intervention by US Seventh Fleet. Reasons given for possible US intervention: (a) with the programme of scaling down the (US) basing arrangements in S.E. Asia,... and when the future of that region looked uncertain, could the US afford the risk of breaking the status-quo of South Asia? (b) particularly when it was being initiated in the background of Indo-Soviet Treaty, could the US accept the rise of Russian influence in South Asia which was about to decapaciate its staunch ally (Pakistan)?....”

 

এই বৈঠক সম্পর্কে কিছু বর্ণনা আবশ্যকপাকিস্তানের সঙ্গে নিকটভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠার পর দ্রুতগতিতে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী দখল থেকে মুক্ত করা সম্ভব - এই অনুমানের উপর নির্ভর করে বর্তমান ও সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশেষণ এবং এর মাধ্যমে মূল সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে সেগুলি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কাজের পরিসীমা নির্ধারণই এই সব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে উচ্চতর রাজনৈতিক অনুমোদনের পর বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা ও প্রোগ্রাম প্রণয়ন সম্ভব হয়স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে ঐ সন্ধ্যায় যে আলোচনা হয়, তাতে দ্বিমতের অবকাশ ছিল নাপ্রায় আট মাস ধরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের স্থানীয় অনুচরবৃন্দ বর্ণনাতীত হত্যা, নির্যাতন ও বিভীষিকার রাজত্ব চালিয়ে এসেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণবিহীন বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র তরুণের দল মরণপণ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ফলে গোটা সমাজ সর্বাংশে আলোড়িত হয়েছেতারই উপর এক সর্বাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হতে চলেছেএই সব কিছুর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক জীবনে যে অকল্পনীয় তোলপাড় অবধারিত, তা নিয়ন্ত্রণ করা যে কোন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই দুঃসাধ্য ব্যাপারস্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র তরুণদের নিয়োগের ফলে পূর্ববর্তী ছ’মাস কার্যত এক ধরনের সমাজবিপ্লবের সূচনা ঘটেশত্রুসেনা ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই সশস্ত্র তরুণদের ক্রমবর্ধিত তৎপরতা পুরাতন ব্যবস্থার সুবিধাভোগী শ্রেণীর দুর্গতির সৃষ্টি করা ছাড়াও পুরাতন সমাজের খোদ কাঠামোকেই আঘাত করতে শুরু করেকিন্তু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তরুণ যোদ্ধাদের কোন নতুন সামাজিক মূল্যবোধে ও বিকল্প সমাজব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকারে উদ্বুদ্ধ করে তোলা, অথবা কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে তাদের সংহত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলা সম্ভব না হওয়ায় প্রত্যাসন্ন স্বাধীনতার পর সামাজিক পুনর্গঠনের ঐক্যবদ্ধ শক্তির পরিবর্তে বহুধা বিভক্ত সশস্ত্র গ্রুপ ও সামাজিক অরাজকতার শক্তির অভ্যুদয়ের আশঙ্কা ছিল অপেক্ষাকৃত প্রবলএক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রচারযন্ত্রের ব্যর্থতা স্বীকার্য কিন্তু তা আর তখন সংশোধনযোগ্য নয়এই অবস্থায় প্রত্যাশিত স্বাধীনতাকে সম্ভাব্য সামাজিক অরাজকতা ও সশস্ত্র হানাহানির আবর্ত থেকে রক্ষা করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র ফেরত নেওয়ার সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ সর্বাপেক্ষা জরুরী বিষয় বলে চিহ্নিত করা হয়যেহেতু বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল ছিল, সেহেতু দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের যে অংশ সততা, সাহস ও কর্তব্যবোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তাদের সকলকে স্বাধীনতা সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলির মিলিত কমান্ডব্যবস্থার অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের সহায়তায় অস্ত্র পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা চালানো অপেক্ষাকৃত যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়পরবর্তী কয়েক দিন তাজউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনার ফলে এই চিন্তার আরও সম্প্রসারণ ঘটে এবং বহুদলীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে সকল মুক্তিযোদ্ধার সমবায়ে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে প্রয়োজনীয় স্ক্রীনিং-এর পর নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন গঠনমূলক প্রয়োজনে তাদের সদ্ব্যবহার করার পক্ষে এক পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরী হতে থাকেতবে ১৯শে নভেম্বরের ঐ বৈঠকে বহুদলীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অস্ত্র পুনরুদ্ধারের কর্মসূচী কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি ও পরোক্ষ সহায়তার প্রশ্ন নির্দিষ্টভাবেই উত্থাপিত হয়

 

ডি. পি. ধর পূর্ববর্তী তিন মাসে বাংলাদেশের সর্বস্তরের সর্বাধিক সংখ্যক প্রতিনিধির সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা চালানোর ফলে একটি বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণার অধিকারী হন এবং দু’একবার তা তিনি আমার কাছে ব্যক্তও করেন: বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী সেখানে যত অল্প সময় অবস্থান করবে, মিত্র হিসাবে ভারতের অর্জিত সুনাম ততবেশী অক্ষুণ্ন থাকবেকাজেই ডি. পি. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আমার কাছে জানতে চান, সর্বাধিক কতদিন ভারতীয় সৈন্যকে বাংলাদেশে থাকতে হতে পারে বলে আমাদের ধারণা? এ প্রশ্নের উত্তর অংশত নির্ভরশীল ছিল, পলায়ন বা পরাজয় বরণের আগে পাকিস্তানী বাহিনী অধিকৃত প্রশাসন ও অবকাঠামোর কতখানি ধ্বংসসাধন করবে এবং অংশত পরাজয়ের পর পাকিস্তান তার হৃত উপনিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে কোন নতুন সামরিক উদ্যোগ গ্রহণ করবে কিনা তার উপরপাকিস্তান যদি পরাজয় বরণের আগে কোন ‘পোড়ামাটির নীতি’ (scorched earth policy) অবলম্বনের সুযোগ না পায় এবং পরাজয়ের পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা হারায়, তবে আশা করা যায়, তিন-চার মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীকে ন্যূনতম কর্মদক্ষতার মানে উন্নীত করা সম্ভব; এরই পাশাপাশি সম্মিলিত রাজনৈতিক কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় অস্ত্রশস্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য বহুলাংশেই অর্জন করা সম্ভবআর যদি শেখ মুজিব তাঁর বিরাট জনপ্রিয়তা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সক্ষম হন, এবং সরকারের দায়িত্ব তুলে নেবার পরেও জাতির ঐক্যবোধ এবং সম্মিলিত আস্থার প্রতীক বহুদলীয় কমান্ডকাঠামোকে কার্যকর রাখেন, তবে আরো আগে বা অধিকতর সাফল্যের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভবততদিন পর্যন্ত ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি বাংলাদেশের সম্ভাব্য অরাজক পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য আমাদের বিবেচনায় অপরহার্য বলে আমি উল্লেখ করি

 

মধ্যরাত্রির পর ডি. পি. ধর যখন আমাকে বিদায় জ্ঞাপনের জন্য হোটেলের লিফ্‌টের দিকে এগিয়ে চলেন, তখন পরবর্তী বৈঠকের আলোচ্য বিষয় হিসাবে প্রথমবারের মত আমি উল্লেখ করি, আমাদের বিবেচনায়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের চূড়ান্ত পতন বন্ধ করার জন্য সপ্তম রণতরী বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়ে ঢাকার উপর বিমান-আচ্ছাদন বিস্তার এবং নৌসেনা অবতরণের চেষ্টা চালাতে পারেডি. পি. ধর পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, কংগ্রেসের উভয় পরিষদ এবং সংবাদমাধ্যমসমূহের প্রবল সমালোচনার পটভূমিতে এহেন হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা ‘রাজনৈতিকভাবে খুবই দূরবর্তী’ বলে মন্তব্য করেনকিন্তু যে সহজ ও আপাতসিদ্ধ   যুক্তি উল্লেখমাত্র তিনি তৎক্ষণাৎ ব্যক্ত আশঙ্কার বিশেষণে প্রবৃত্ত হন তা ছিল: দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে জোট-বহির্ভূত ভারতের প্রভাব ও শক্তিকে সীমিত করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সতের বছর যাবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ‘মুসলিম পাকিস্তান’কে সবল করার জন্য সাহায্য করে এসেছে, সেখানে সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের মত ঔদ্ধত্য দেখাবার পর, সেই ভারত যদি বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াসে উদ্যোগী হয়, তবে কেবল জনমতের ভয়েই কি যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার আঞ্চলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দেবে? জনমতই যদি মার্কিন প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্তের একমাত্র নিয়ন্ত্রক হয়, তবে অনেক আগেই কি ভিয়েতনামে শান্তি ঘোষিত হওয়া সম্ভব ছিল না? এরপর এক ঘণ্টারও অধিক সময় ধরে এই হস্তক্ষেপ সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক, সমগ্র অভিযানের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব, পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ ও পরিসর প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আমাদের দু’জনার মধ্যে আলোচনা চলে২৩৪

 

ডি. পি. ধরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত পরবর্তী তিনটি বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অস্ত্র পুনরুদ্ধার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে স্বাধীনতা সমর্থক পাঁচটি রাজনৈতিক দলের অভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ এবং জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিকে একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সম্ভাবনা-সংক্রান্ত আলোচনা প্রাধান্য পায়এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্র অধিকৃত প্রশাসনের সমস্ত বাঙালী অফিসার এবং সর্বস্তরের বাঙালী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার এক পরিকল্পনা পাকিস্তানীদের রয়েছে বলে অক্টোবরে আমাদের ঢাকা গ্রুপ থেকে যে তথ্য এসে পৌঁছায়, তার তাৎপর্য এবং তা মোকাবিলার্থ বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতির বিষয় আলোচিত হয়এই সব আলোচনা যখন চলছিল, তখন যশোর শহরের অদূরে চৌগাছায় একটি মুক্তিবাহিনী ইউনিটের অবস্থানের উপর ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ ইউনিটসহ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের ফলে সীমান্ত সংঘাত সহসা বৃদ্ধি পায়পাকিস্তানী গোলার আঘাত ভারতীয় ভূখণ্ডে এসে পড়ায় যথাযোগ্য শক্তিতে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে এগিয়ে আসেভারত ও পাকিস্তানের উভয় পক্ষের পদাতিক ব্রিগেড, ট্যাঙ্ক, গোলন্দাজ ও বিমানবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আবহাওয়া নিকটতর হয়ে ওঠে২৩৫

 

একই সময়ে পরিকল্পনা সেল ও বিভাগীয় সচিবদের পর্যায়ে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর পুনর্বাসন, আইন ও শৃঙ্খলা প্রবর্তন, খাদ্য ও জরুরী পণ্য সরবরাহ, বাসস্থান, জনস্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে যে সব খসড়া পরিকল্পনা ও কার্যক্রম প্রণয়নের কাজ চলছিল, তাকে সমন্বিত করার জন্য ২২শে নভেম্বরে বাংলাদেশে মন্ত্রিসভার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং এই উদ্দেশ্যে সেক্রেটারীদের সমবায়ে এক সাবকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত করা হয়দেশ মুক্ত হওয়ার পর বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রিসভা এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, অধিকৃত অঞ্চলে সরকারী অফিসার ও কর্মচারী যারা দৃশ্যত পাকিস্তানীদের সাথে সহযোগিতা করে চলেছেন, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই প্রাণের ভয়ে তা করতে বাধ্য হয়েছেন এবং প্রকৃতপক্ষে তারা স্বাধীনতাযুদ্ধের গোপন সমর্থক২৩৬

 

স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত অভিযান এবং বিশেষ করে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও কর্মসূচী প্রণয়নের এই প্রচেষ্টার মূল্যায়নকালে একটি কথা স্মরণ রাখা বোধ হয় বাঞ্ছনীয়২৬শে মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের দিন থেকে শুরু করে ১৬ই ডিসেম্বর তাদের আত্মসমর্পণের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলে নয় মাসেরও কম সময়চীন, ভিয়েতনাম, আলজিরিয়া, সাইপ্রাসের বা এঙ্গোলার তুলনায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সমগ্র মেয়াদ ছিল সব চাইতে কমমুক্তিসংগ্রামের নয় মাসের প্রথম অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয়দানের ফলে ভারতের জন্য যে বৈদেশিক আক্রমণের বিপদ দেখা দেয় তার বিরুদ্ধে ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা সুদৃঢ় করার কাজেআগস্টে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির মাধ্যমে ভারতের নিরাপত্তাবোধ উন্নত হওয়ার পরেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভারতীয় সহায়তার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেকিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য নিশ্চিতকরণ ব্যতীত শরণার্থী সমস্যার কোন প্রকৃত সমাধান যে একেবারেই নেই, ভারতের এই উপলব্ধির প্রতি সোভিয়েট ইউনিয়নের পরোক্ষ সম্মতি আদায় করতে আরো দু’মাস অতিবাহিত হয়পাকিস্তানের সঙ্কটের একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সোভিয়েট প্রচেষ্টা নিঃশেষিত হওয়ার পর অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদানের এক সম্ভাব্য সময়সূচী সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে প্রথম ইঙ্গিত দেনঐ সময় থেকে ৩রা ডিসেম্বরে পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার দিন পর্যন্ত মোট সময় পাওয়া যায় ছয় সপ্তাহের কম এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দিন পর্যন্ত আট সপ্তাহের কমএই ছয় থেকে আট সপ্তাহের স্বল্প সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তুলনাহীন বর্বরতার ফলে সর্বাংশে ছিন্ন ভিন্ন এক সমাজকে একত্রিত করার জন্য, বিচ্ছিন্ন বিপর্যস্ত ও লুণ্ঠিত এক অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করার জন্য এবং এই দুই বিশাল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ নতুন এক রাষ্ট্রের সংগঠনকে দাঁড় করানোর জন্য যে সুবিপুল প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল তা আয়ত্ত করা কোন উপায়েই সম্ভব ছিল নাসময় ছাড়াও অভাব ছিল সংগঠনের-উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন, কর্মদক্ষ, নিষ্ঠাবান মানুষেরএই অর্থে নভেম্বর ছিল প্রয়োজন ও আয়োজনের মাঝে দুস্তর ব্যবধান উপলব্ধি করার মাসএই ব্যবধান দুরতিক্রম্য জেনেও যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন স্বাধীনতার তীরভূমির দিকে পাড়ি জমাবার মাস

 

ঘটনা-উত্তাল নভেম্বরে একদিকে দেশের অভ্যন্তরে শহর-বন্দর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম, আর এই সংগ্রামেরই সাফল্যজনক পরিসমাপ্তির জন্য আসন্ন শীতে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর সংঘবদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি, এবং অন্যদিকে শীতের পূর্বেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের অবস্থা সৃষ্টি করে বৃহৎ মিত্রদের হস্তক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক তদারকিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতাবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে অবলুপ্ত করার জন্য পাকিস্তানী সামরিক চক্রের প্রয়াস-এই দুই পরস্পরবিরোধী ঘটনাস্রোতের মাঝে বাংলাদেশের বিঘোষিত স্বাধীনতা যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, তা তাজউদ্দিন ২৩শে নভেম্বরের বেতার ভাষণে সুনির্দিষ্টভাবে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেন:

 

“মুক্তিবাহিনী এখন যে কোন সময়ে, যে কোন জায়গায় শত্রুকে আঘাত করতে পারে; এমনকি শত্রুর নিরাপদ অবস্থানের কেন্দ্রে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে তাকে বিমূঢ় করে দিতে পারে।... নদীপথে হানাদাররা বিপর্যস্ত, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর প্রায় অকেজো, বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্তক্রমেই অধিক জায়গায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর প্রশাসন চালু হচ্ছেআর সৈন্য সামগ্রী ও মনোবল হারিয়ে শত্রুপক্ষ ততই হতাশায় উন্মাদ হয়ে উঠেছে।... এখন তারা চায় ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সঙ্কট সৃষ্টি করতেতারা আশা করে যে, এমন একটা যুদ্ধ হলে, বাংলাদেশের রক্ষক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের থেকে পৃথিবীর দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ হবে, মুক্তিবাহিনীর হাতে তাদের পরাজয়ের গ্লানি গোপন করা যাবে এবং এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হবে যাতে তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবেকিন্তু আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছি যে, এর একটি উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে না।... সামরিক শাসকচক্র আত্মহত্যার যে ব্যবস্থাই করে থাকুক না কেন আর এই উপমহাদেশের জন্য যে ব্যবস্থাই বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রের মনঃপুত হোক না কেন, বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা একটিই-আর তা হল পূর্ণ স্বাধীনতাইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রতিদিন প্রমাণিত হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সংকল্প এবং সে স্বাধীনতা রক্ষার শক্তিদখলদার বাহিনীর বিনাশ অথবা সম্পূর্ণ অপসারণের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্যইতিহাস মানুষকে অন্তত এই শিক্ষা দিয়েছে যে, জনসাধারণের ইচ্ছাশক্তির পরাজয় নেই-এমনকি এক বিশ্ব শক্তির সমরসম্ভার দিয়েও জনগণের মুক্তিসংগ্রাম দমন করা যায় না

 

“অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতার জন্য আমরা লড়ছি, সে স্বাধীনতা লাভের দিনটি নিকটতম হয়েছেকিন্তু তার জন্যে আরো আত্মত্যাগ, কষ্ট স্বীকার ও জীবন দানের প্রয়োজন হবেস্বাধীনতার ধারণা অশেষ অর্থগর্ভস্বাধীনতার তাৎপর্য নির্ভর করে যুদ্ধ অবস্থায় আমরা কি মূল্য দিই এবং শান্তির সময়ে এর কি ব্যবহার করি তার উপরশত্রু সংহারের প্রতিজ্ঞা সঙ্গে সঙ্গে তাই শহীদের রক্তের উপযুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিজ্ঞাও আমাদেরকে নতুন করে নিতে হবেবাংলাদেশের শহরে ও গ্রামে তরুণেরা যে যুদ্ধে লিপ্ত তা বিদেশী দখলদারদের বিতাড়িত করার সংগ্রাম এবং অসাম্য ও সুবিধাভোগের অবসান ঘটানোর সংগ্রাম।...

 

“বাংলাদেশের জনসাধারণের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজও পাকিস্তানের সামরিকচক্রের হাতে বন্দী হয়ে রয়েছেনআমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, তাকে মুক্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে হানাদার সৈন্যদের নিষ্ক্রমণের সকল পথ রুদ্ধ করে দেওয়াতা করবার শক্তি আমাদের আছে এবং আমরা তা-ই করতে যাচ্ছি”...

 

তাজউদ্দিনের এই বেতার ঘোষণায় কোন অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির আড়ম্বর ছিল না, ছিল কঠোর প্রস্তুতির শেষে আসন্ন ঘটনাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করার অটল আত্মবিশ্বাস

 

 

 

 

আগের অধ্যায়           পরের অধ্যায়

 

 

 

২১৭   চতুর্দশ অধ্যায়ে আলোচিত   Back to main text

 

২১৮   ‘ডন’, ৫ই আগস্ট, ’৭১   Back to main text

 

২১৯   ‘গার্ডিয়ান’, ৬ই আগস্ট, ’৭১   Back to main text

 

২২০   ‘ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন’, ৯ই আগস্ট, ’৭১   Back to main text

 

২২১   ‘ডন’, ১০ই আগস্ট, ’৭১   Back to main text

 

২২২   ‘ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন’, ১০ই আগস্ট, ’৭১   Back to main text

 

২২৩   ‘ডন’, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ’৭১   Back to main text

 

২২৪   ‘টাইমস্‌’ এবং ‘ডেইলী টেলিগ্রাফ’, ১৩ই অক্টোবর, ’৭১   Back to main text

 

২২৫   “A detail list of constituencies involved shows that the Dhaka seat won by Sheikh Mujibur Rahman... is not among the seats declared vacant. The neighbouring seat held by Dr. Kamal Hossain is also not left open.”_The Times, October 11, ’71.

         Back to main text

 

২২৬   “What we do after sentence has been passed is the prerogative of the head of state. I cannot release him on whim. It is one hell of a responsibility. But if the nation demands his release, I will do it.”_Arnoud de Borchgrave, International Herald Tribune, November 1, ’71.

Back to main text

 

২২৭   “Yahya was prepared finally to hold discussion with some Awami League leaders or Bangladesh leaders in India not charged with major crime; and he said he would consider the idea of meeting some one designated by Mujib.”_The White House Years, p. 878.

         Back to main text

 

২২৮   এই অনুমান যে অবাস্তব ছিল না, তা ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে প্রকাশিত প্রখ্যাত কলামিস্ট জ্যাক এন্ডারসনের এক প্রতিবেদনে অংশত সমর্থিত হয়: ‘(US Ambassador) Farland insisted he used his meetings with Yahya as a peace maker. “When the history books are written on the war, it will be shown that US policy, and our local efforts in Pakistan, kept Mujib alive”, he said. “After Mujib’s arrest, I talked frequently with Yahya and often mentioned Mujib. I told Yahya that we felt that Mujib was the key to future stability in Pakistan, east and west. I counselled Yahya not to kill this man. And finally, one night during the early summer, Yahya said to me, ‘you have convinced me. He will not he executed.”_Jack Anderson: The Anderson Papers, p. 222.

         Back to main text

 

২২৯   দেশ মুক্ত হওয়ার অল্পকাল থেকেই মুখ্যত ক্ষমতার রাজনীতির প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেভাবে একের পর এক বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে আত্মপ্রচারবিমুখ তাজউদ্দিনের এই মূল ও সর্বাগ্রগণ্য ভূমিকার কেবল অবলুপ্তি সম্পন্ন হয়নি, তাঁর চরিত্র হননও সম্পূর্ণ করা হয়েছে বলে এক সময় মনে করা হতমুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ঘাটনে উৎসুক গবেষকবৃন্দ ’৭১ সালের সংশ্লিষ্ট ভারতীয় নীতি-নির্ধারক ও উচ্চতর ব্যবস্থাপকদের মধ্যে এখনও যাঁরা জীবিত আছেন, তাদের এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সহায়তায় বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রচলিত বিভ্রান্তি বহুলাংশে দূর করতে পারেন   Back to main text

 

২৩০   “It was apparent that to reach Dacca within the planned schedule of 21 days would require a high degree of mobility, short, snappy actions to overcome Pakistani resistance, and a large quantity of bridging and rafting equipment as well as engineer resources to cross the formidable river obstacles. The required engineer resources could not be mustered along all approaches but could with some effort be collected for the main thrust when required. Because of these limitations the higher command, in assigning task to Eastern command, did not spell out the capture of Dacca but left it to be considered during the conduct of operations as and when opportunity offered itself.”_Maj. Gen. Sukhwant Singh: The Liberation of Bangladesh, Vol. I, p. 91 (মেজর জেনারেল সুখওয়ান্ত সিং ১৯৭১ সালে দিল্লী সামরিক সদর দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর অব মিলিটারী অপারেশন্স (DDMO) হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন)

         “In fact, the macroplanning in Delhi as well as Calcutta did not indicate focusing sights on Dacca. It was directed towards clearing the territory upto the rivers and was silent about the ultimate objective. The lack of a clear directive that Dacca was the ultimate objective, made it difficult for subordinate commanders to select the intermediate objectives along which they could direct their full energies to capturing Dacca with the least delay.”_Maj. Gen. Lachhman Singh: Victory in Bangladesh, p. 48 (মেজর জেনারেল লছমন্‌ সিং বাংলাদেশের যুদ্ধে একটি ভারতীয় পার্বত্য ডিভিশনের অধিনায়ক ছিলেন)   Back to main text

 

২৩১   “The Eastern Command had still not comprehended the danger and Niazi was still under the impression that the Indians were trying to capture a chunk of East Pakistan territory and their attacks would be confined to the borders... Dacca defences were lying unmanned without any fighting troops in the area. The Eastern command had no plans to withdraw the troops to Dacca_Pakistan’s Crisis in Leadership, p. 166-7. উপরোক্ত গ্রন্থের লেখক মেজর জেনারেল ফজল মুকীম খানের বিবরণ থেকে আরও জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য পাকিস্তানী বাহিনী নভেম্বরের প্রথম থেকে নগরবাড়ী থেকে ফুলছড়িঘাট পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদী বরাবর দীর্ঘ চর এলাকায়, টাঙ্গাইল-মির্জাপুর বনভূমি এলাকায়, নরসিংদী এলাকায় এবং সর্বশেষ ১৭ই নভেম্বর খোদ ঢাকা নগরীতে কারফিউ জারী করে যে ‘পরিষ্করণ অভিযান’ চালায় তার সামরিক সুফল তাদের জন্য ‘অতি সামান্যই’ ঘটেকিন্তু এর ফলে, তাঁর ভাষায়: “This created further dispersion of effort and by this time virtually all reserves have been committed passed extraction. Without Sector reserves, the plan of fighting from strong points completely collapsed. In case of an Indian invasion, even if the troops could manage to fall back on so-called strong points they would become besieged garrisons.”_p. 128-9.

         Back to main text

 

২৩২   সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত   Back to main text

 

২৩৩   বিদেশী সংবাদদাতাদের মধ্যে ‘টাইমস্‌’-এর পিটার হেজেলহার্স্ট একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই অতীব গোপনীয় আলোচনা সম্পর্কে কিছুটা সংবাদ সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছিলেন: “Mr. Tajuddin Ahmed, the Prime Minister of Bangladesh, had arrived in Delhi to meet senior Indian officials. It is understood that Mr. Ahmed and Indian authorities are working out the details of an Indo-Bangladesh friendship treaty which will incorporate clauses relating to a defence pact. It is believed that if Delhi is forced into a war the defence clauses could be invoked by the Bengalis to invite Indian forces into Bangladesh. At the time, the treaty would justify India’s decision to meet the Bengalis’ demand: for arms and military assistance.”_The Times, November 17, ’71. এই আলোচনা যে শেষ পর্যন্ত চুক্তি অবধি পৌঁছাতে পারেনি তা টাইমস্‌-সংবাদদাতার অজ্ঞাত ছিলকিন্তু সম্ভবত তাঁর এই রিপোর্টের জন্য ’৭১ সালে ভারতের সাথে ‘গোপন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় এই মর্মে এক ধরনের প্রচারণা অনেক বছর ধরে চালু থাকে   Back to main text

 

২৩৪   ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ডি. পি. ধর ঢাকায় কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাঝে মার্কিন নৌবাহিনীর সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ সম্পর্কে পূর্ব সতর্কীকরণের ‘সকল কৃতিত্ব’ আমাদের প্রদান করেন এবং জানান, সেই রাত্রিতেই তিনি এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরী করেন, যাতে পরদিন প্রাতঃকালেই সংশ্লিষ্ট মহলকে এই সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করে দেওয়া সম্ভব হয়পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানের পর মনে হয়েছে, সম্ভবত তাঁর এই প্রশংসা নিছক সৌজন্যমূলক অতিশয়োক্তি ছিল না   Back to main text

 

২৩৫   ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর নিরেট সামরিক তৎপরতার বিষয়েও ঊর্ধ্বতন বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ/পরামর্শ যে কার্যকর থাকতে পারে, সে সম্পর্কে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক হবে না২১শে নভেম্বর অপরাহ্ণে, ডি. পি. ধর এবং আমার আলোচনার মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে মেজর জেনারেল সরকার এসে উপস্থিত হন এবং স্পষ্টতই আমার উপস্থিতির জন্য দ্বিধার ভাব প্রকাশ করেনডি. পি ধর আমার উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করার পক্ষে ইঙ্গিত করায়, সরকার সংক্ষেপে জানান, চৌগাছার সংঘর্ষে পাকিস্তানী সীমানার বেশ খানিকটা ভিতরে তিনটি ভারতীয় ট্যাঙ্ক অচল হয়ে পড়েছে এবং পাকিস্তানের সিগন্যাল থেকে তারা জানতে পেরেছেন বিদেশী সাংবাদিকদের অকুস্থলে আনার ব্যবস্থা চলেছে; সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে প্রতিপক্ষকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য কামান দেগে চলেছে; স্থায়ী ব্যবস্থা হল হয় সেগুলি টেনে আনা, যা কর্দমাক্ত ভূমি বলে এ যাবত সফল হয়নি; নতুবা এর বিকল্প হল বিস্ফোরক ব্যবহার করে অচল ট্যাঙ্কগুলো টুকরো টুকরো করে ফেলা, যদিও তার চিহ্ন থেকে যাবে; কি কর্তব্য? ডি. পি. প্রথম বিকল্পের পক্ষে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত দেন, একান্তভাবেই সম্ভব না হলে দ্বিতীয় পথ অগত্যাদ্বিরুক্তি না করে সরকার বিদায় নেন   Back to main text

 

২৩৬   এ বিষয় সম্পর্কে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্তের জন্য পরিশিষ্ট ঠ দ্রষ্টব্য   Back to main text