১৭

 

 

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যে সব উপদলীয় তৎপরতা সেপ্টেম্বরে প্রমত্ত হয়ে উঠেছিল, অক্টোবরের প্রথম দিকে তা মন্দীভূত হয়ে পড়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বরের শেষে ভারত-সোভিয়েট যুক্ত ঘোষণা সম্পর্কে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার বৈঠকে যে চুলচেরা আলোচনা হয়, তার ফলে যোগদানকারী কারো জন্যেই এ কথা দুর্বোধ্য ছিল না যে, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের অনুকূলে মিত্রভাবাপন্ন বৈদেশিক শক্তিসমূহের সমঝোতা সম্পন্ন প্রায় সম্ভবত তাঁদের মধ্যে এ উপলব্ধিও ঘটে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুকূলে সোভিয়েট ভূমিকাকে নিকটবর্তী করার জন্য ‘জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি’ গঠনের বিষয়ে তাজউদ্দিনের নেপথ্য উদ্যোগ অসঙ্গত ছিল নাএই সব আশাবাদ ও উপলব্ধির ফলে মন্ত্রিসভার কাজকর্মে এক নতুন গতি ও মতৈক্য পরিলক্ষিত হয়ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপর করে তোলা, নিয়মিত বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধান হ্রাস করা, সরকারী প্রশাসনকে সংহত ও সক্রিয় করা, এমনকি যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন মন্ত্রিসভার এই সব গঠনমুখী সিদ্ধান্ত থেকে প্রতীয়মান হয়, মন্ত্রিসভাকে বিভক্ত করার জন্য যে বৈদেশিক স্বার্থ পূর্ববর্তী কয়েক মাস যাবত সাতিশয় সক্রিয় ছিল, খোন্দকার মোশতাকের আমেরিকা গমনের অক্ষমতা প্রকাশ পাওয়ার পর সেই স্বার্থ অন্তত অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপ পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্বাপেক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে

 

নীতিগত কারণে তাজউদ্দিন-অনুসৃত পন্থার বিরুদ্ধে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের বিরোধিতা খানিকটা হ্রাস পেলেও এই বিরোধিতার ব্যক্তিগত উপাদান সম্ভবত কারো কারো ক্ষেত্রে অটুট থাকে অন্তত তাঁদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলগুলির প্রচারণার ধারায় তাজউদ্দিনবিরোধী উক্তির কোন ঘাটতি ছিল নাকিছু তারতম্য দেখা যায় কেবল অভিযোগের বিষয়বস্তুর বিভিন্নতায় অক্টোবরের আগে অবধি তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধবাদীদের মূল প্রচারণা ছিল: তাজউদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধের নীতি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, ভারতের ভূমিকা অস্পষ্ট বা ক্ষতিকর এবং সোভিয়েট ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভারত-সোভিয়েট যুক্ত ঘোষণার প্রতি বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার সমর্থনসূচক বিবৃতির পর এই প্রচারণার কার্যকারিতা যখন হ্রাস পায়, তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে তখন এই অভিযোগই বড় করে তোলা হয় যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবাসী সরকারের সর্বস্তরে ‘আওয়ামী লীগের দলগত স্বার্থ নিদারুণভাবে অবহেলা করে চলেছেন’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শের প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিদের জোরদার করছেন’ এই অবস্থার প্রতিবিধানের জন্য আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের তলবী সভা অনুষ্ঠানের দাবী শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাজউদ্দিনকে অপসারণের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রকাশ্য আন্দোলনের আড়ালে১৭৯  বিভিন্ন উপদলের যোগসাজশ জোরদার হয় বিভিন্ন উপদলের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সফর ও প্রচার অভিযানের ফলে বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে

 

বিভিন্ন অঞ্চলে মন্ত্রীদের সফর জোরদার করার পক্ষে অক্টোবরের শুরুতে মন্ত্রিসভা এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় খোন্দকার মোশতাক নিজেও ৬ থেকে ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিলের সঙ্গে এবং সেক্টর কমান্ডারদের কারো কারো সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কোলকাতা ত্যাগ করেনতাঁর এই সফর অপেক্ষাকৃত তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে এ কারণেও যে সমগ্র সফরকালের জন্য তাঁর সঙ্গী ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী১৮০  যোগাযোগ ব্যবস্থাবর্জিত এই সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পররাষ্ট্র বিভাগের সদল দফতর থেকে প্রায় দু’সপ্তাহের জন্য মাহবুব আলমের অনুপস্থিতির কারণ মুখ্যতই রাজনৈতিক বলে প্রতীয়মান হয় অন্তত বিভিন্ন আঞ্চলিক কাউন্সিলের নেতৃবর্গের সঙ্গে মোশতাকের আলাপ-আলোচনার যে সব খবর কোলকাতা এসে পৌঁছাত, তা থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে নিদারুণ আশাভঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর পদে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপার তখনও তিনি সবিশেষ আগ্রহীতবে পুনরায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের আপোসহীন সমর্থকএবং কেবল তাঁর নেতৃত্বেই এই যুদ্ধ পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে এই ধরনের একটি ভাবমূর্তি গঠনের জন্য পরিষদ সদস্য ও দলীয় নেতৃবৃন্দের কাছে তাঁর বক্তব্য দৃশ্যত গঠনমূলক হয়ে ওঠে এমনকি তাঁর এই সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভার কাছে লিখিত রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ভারত সরকারের তুষ্টির কারণ হতে পারে, এমন কিছু মার্জিত মন্তব্য তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অবশ্য একই সঙ্গে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে সেরনিয়াবাত-শেখ আজিজ নেতৃত্বাধীন গ্রুপ এবং শেখ মণি পরিচালিত ‘মুজিব বাহিনী’র প্রকাশ্য বিদ্রোহের পিছনে ইন্ধন যোগানের ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ব-ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই সব উপদলীয় তৎপরতা দলের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মাঝে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়তা ছাড়া, আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তাজউদ্দিন কার্যকরী সংসদের সভা ২০শে অক্টোবর ধার্য করায় তলবী সভা আহ্বানের পক্ষে বিরোধী উপদলগুলির তোড়জোড়ও ভণ্ডুল হয়ে পড়ে

 

অক্টোবরের প্রথমার্ধে একমাত্র ‘মুজিব বাহিনী’র একাংশের কার্যকলাপে বরং অধিকতর বেপরোয়াভাব পরিলক্ষিত হয়এই বেপরোয়াভাবের কতটা তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির পরিচায়ক, কতটা পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার নির্দেশক অথবা কতটা তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতাজনিত অধীরতার পরিমাপক, তা বলা কঠিন অক্টোবরে বৈদেশিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে মিত্রভাবাপন্ন শক্তিসমূহের সমন্বয় এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধিত সমাবেশ কোন্‌ প্রত্যাসন্ন বোঝাপড়ার প্রস্তুতি, সে সম্পর্কে অনবহিত এই তরুণ নেতৃত্ব তখনও তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে তাদের পুরাতন প্রচারণায় মত্ত: ‘তাজউদ্দিনই বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার হওয়ার কারণ,’ ‘তাজউদ্দিন যতদিন প্রধানমন্ত্রী, ততদিন ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের স্বীকৃতিদান অসম্ভব‘তাজউদ্দিন ও মন্ত্রিসভা যতদিন ক্ষমতায় আসীন ততদিন বাংলাদেশের মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়’ এই সব বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা, আওয়ামী লীগের একাংশের সঙ্গে তাদের সংঘাত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কোন কোন ইউনিটের সঙ্গে তাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, এমনকি নৌকমান্ডোদের সাথে তাদের অসহযোগী আচরণের সংবাদ প্রচারিত হয়ে পড়ার দরুন রাজনৈতিকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ ক্রমেই বেশী অপ্রিয় ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে শুরু করে১৮১  তা ছাড়া ‘মুজিব বাহিনী’র চার নেতাকেই তাদের পৃষ্ঠপোষকগণ উপমহাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির আলোকে তাজউদ্দিন তথা মন্ত্রিসভাবিরোধী তৎপরতা থেকে বিরত হওয়ার ‘পরামর্শ দান শুরু করেছেন বলে অক্টোবরের মাঝামাঝি ভারতীয় সূত্র থেকে আমাদের জানানো হয় বাংলাদেশ সূত্র থেকে জানা যায়, কথিত পরামর্শের মুখে শেখ মণির ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকলেও, ‘মুজিব বাহিনী’র দ্বিতীয় প্রধান নেতা হিসাবে পরিচিত সিরাজুল আলম খান তাজউদ্দিন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করায় এই দুই যুবনেতার মধ্যে মতপার্থক্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছেএই অবস্থায় ‘মুজিব বাহিনী’র নেতৃত্বের একাংশের পক্ষে অধীর হয়ে পড়া অস্বাভাবিক ছিল না; বস্তুত তাদের এই অধীরতার সহিংস প্রকাশ ঘটে তাজউদ্দিনের প্রাণনাশের অসফল প্রয়াসের মধ্য দিয়ে

 

‘মুজিব বাহিনী’র সদস্য হিসাবে পরিচয়দানকারী এক যুবক আগ্নেয়াস্ত্রসহ সহসা একদিন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে হাজির হয়ে জানায় যে, তাদের এক নেতা তাজউদ্দিনের প্রাণ সংহারের প্রয়োজন উল্লেখ করা মাত্র স্বেচ্ছায় সে এই দায়িত্ব নিয়ে সেখানে এসেছে, যাতে তাজউদ্দিনের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয় তাজউদ্দিন তখন অফিসে সম্পূর্ণ একা১৮২  তাজউদ্দিন কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে এই যুবক তাঁকে আরো জানায় যে, এ বিষয়ে সে পূর্ণ স্বীকারোক্তি করার জন্য প্রস্তুত এবং কৃত অপরাধের জন্য কর্তৃপক্ষ যদি তার কোন শাস্তি বিধান করেনও, তবু তাতে তার কোন আপত্তি নেই তাজউদ্দিন আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের পর অস্ত্রসমেত যুবকটিকে বিদায় দেনসেই সময় ‘মুজিব বাহিনী’র বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কোন কোন ইউনিটের এবং আওয়ামী লীগের একাংশের ক্ষোভ ও বিদ্বেষ এতই প্রবল ছিল যে, এই ঘটনা প্রকাশের পর পাছে কোন রক্ষক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তা রোধ করার জন্য তাজউদ্দিন ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ গোপন করেন১৮৩  কিন্তু সম্ভবত এই ঘটনার  পরেই তাজউদ্দিন মনস্থির করেন ‘মুজিব বাহিনী’র স্বতন্ত্র কমান্ড রক্ষার জন্য RAW-এর প্রয়াসকে নিষ্ক্রিয় করা এবং এই বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগের সময় সমুপস্থিত

 

এই সব উপদলীয় প্রশ্ন নিয়ে সময়ের যথেষ্ট অপচয় ঘটত; অথচ মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও সংহত করার জন্য সময় সদ্ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল সবচাইতে বেশী অক্টোবরের মাঝামাঝি পাকিস্তান ও ভারতের সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ার ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবমানঅথচ তখনও অন্তত ত্রিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং প্রদান বাকীআর যে পঞ্চাশ হাজার ইতিমধ্যে ট্রেনিং লাভ করেছে, তাদেরকে সক্রিয় করে তোলার লক্ষ্য তখনও অনায়ত্ত রিক্রুটমেন্ট থেকে শুরু করে ট্রেনিং, সরবরাহ, শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণ ও তৎপরতা-প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অজস্র সমস্যা প্রত্যহ চিহ্নিত হত, তার প্রশাসনিক সদুত্তর কাগজ-কলমে খুঁজে পাওয়াও মাঝে মাঝে কষ্টকর হত, সেগুলি বাস্তবায়িত করা তো আরো বেশী অসুবিধার কথা১৮৪  মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার এই সব ছোট-বড় দৈনন্দিন সমস্যাবলী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর রাজনৈতিক আদর্শ, এর আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যের সঙ্গে সংগ্রামকে যুক্ত করার কাজটি ছিল আরও বেশী জটিল কেবলমাত্র পাকিস্তানের সামরিক নির্যাতনের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যই যে এই মুক্তিসংগ্রাম, অথবা উঠতি বাঙালী শাসকশ্রেণীর স্বতন্ত্র ক্ষমতাযন্ত্র সৃষ্টির জন্যই যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে পাকিস্তানের মত আর একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা প্রয়োজন-এ কথা এত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ভোগ এবং এত প্রাণ বিসর্জনের পর স্পষ্টতই যুক্তিসঙ্গত ছিল না দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের মৌল প্রয়োজনের জন্য শিল্প জাতীয়করণের নীতি ইতিপূর্বেই মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে ঘোষিত হয়েছে এবং পরিকল্পনা সেল কিছু কিছু মধ্যমেয়াদী পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জন প্রচেষ্টার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার দৈনন্দিন বিষয়গুলিকে গ্রথিত করার জন্য যে সংগঠন, পরিকল্পনা ও উদ্যমের প্রয়োজন ছিল, তা অংশত ব্যর্থ হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার কারণে এবং অংশত সময়ের অপচয়ে ও অভাবে

 

সময়ের প্রয়োজন সত্যই তীব্র ছিল সময়ের প্রয়োজন ছিল যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্তব্যনিষ্ঠ অংশ ক্রমশ সক্রিয় ও সংহত হয়ে উঠতে পারে, যাতে কাজের মাধ্যমে তাদের ভিতর থেকে যোগ্যতর নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটতে পারে, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে সহযোগিতার ঐক্যবন্ধন গড়ে উঠতে পারে, এবং যাতে দেশকে শত্রুমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার ও পুনর্গঠনে নিযুক্ত হতে পারে মাত্র দু-তিন সপ্তাহের প্রাথমিক সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের পর এই বিচ্ছিন্ন, যুদ্ধ-অনভিজ্ঞ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন তরুণদের প্রতিকূল অথবা অসংগঠিত অবস্থার মাঝে নিক্ষেপ করে, এত অল্প সময়ের মধ্যে তাদেরকে সংগ্রামের সুসংহত শক্তিতে পরিণত করা কোন মন্ত্রবলেই সম্ভব ছিল না কিন্তু তাদের বিকাশের জন্য যতখানি সময়ের প্রয়োজন ছিল, তার পথে অন্তত দু’টি বাধা ছিল অতিশয় প্রবল প্রথম সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে নব্বই লক্ষ শরণার্থীর দুর্বিষহ ভার বহনে ভারতের ক্রমবর্ধমান অক্ষমতা দ্বিতীয় উত্তরের গিরিপথগুলি পরবর্তী বসন্তে তুষারমুক্ত হওয়ার আগেই উদ্ভূত সামরিক বিপদ নিষ্পত্তির জন্য ভারতের বোধগম্য ব্যগ্রতা কাজেই, চূড়ান্ত লড়াই বড়জোর ফেব্রুয়ারী অবধি পিছিয়ে দেবার অবকাশ ছিল; যদিও অক্টোবরের মাঝামাঝি পাকিস্তানের সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ার পর যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারটি কেবল ভারত-বাংলাদেশের প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল ছিল না, তা সমভাবেই নির্ভরশীল ছিল পাকিস্তানের নিজস্ব প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তের উপর

 

কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে পাকিস্তানের যুদ্ধ যাত্রার আগেই যদি শীত এসে পড়ে এবং উত্তরের গিরিপথসমূহ তুষারবৃত হওয়ায় পরবর্তী এপ্রিল পর্যন্ত চীনের হস্তক্ষেপ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে পাকিস্তানকে পরবর্তী এপ্রিল/মে পর্যন্ত যুদ্ধের উদ্যোগ গ্রহণ থেকে সম্ভবত বিরত থাকতে হত পাকিস্তানের এই অক্ষমতা সাপেক্ষে শীতের শেষ দিকে চূড়ান্ত লড়াই পিছিয়ে দিয়ে দু’তিন মাস অতিরিক্ত সময় লাভ করা যায় কি না, সে সম্ভাবনাও বিবেচনা করে দেখা হয় সেপ্টেম্বরে তাজউদ্দিন ও ডি. পি. ধর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু আলাপ-আলোচনা করেছিলেন মুক্তাঞ্চল গঠনভিত্তিক পূর্ববর্তী রণনৈতিক চিন্তার অবাস্তবতা তখন উভয় পক্ষের কাছেই যথেষ্ট স্পষ্টতবে সেপ্টেম্বরেই এ জাতীয় মৈত্রীচুক্তি সম্পর্কে সম্মত হওয়া ভারতের জন্য একাধিক কারণেই অসম্ভব ছিলতা ছাড়া উভয় পক্ষের জন্যই এরূপ চুক্তি সম্পাদনের সর্ববৃহৎ বিপদ ছিল এই যে, প্রস্তাবিত চুক্তি যেহেতু বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জ্ঞাপনের সমার্থক, সেহেতু এ কথা প্রকাশিত হলে তৎদণ্ডেই-অর্থাৎ উত্তরের গিরিপথসমূহ তুষারাবৃত হওয়ার আগেই-পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা একরূপ অবধারিত ছিল অবশ্য এই চুক্তিকে গোপন রেখে পাকিস্তানের সম্ভাব্য ত্বরিত প্রতিক্রিয়া এড়ানো যেত কিন্তু চুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়ে ডি. পি. ধরের আলোচনা সত্ত্বেও, এর পক্ষে বা বিপক্ষে ভারত সরকারের মনোভাব সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত হয়নি১৮৫

 

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে অক্টোবরে এমন আশাবাদ খুব অসঙ্গত ছিল না যে এই চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হলে ভারত সরকারের স্বীকৃতি এবং সংগ্রামের চূড়ান্তপর্বে ভারতীয় সৈন্য নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশের আয়ত্তে আসবেএহেন আশাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব-কাঠামোবিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের সংহত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য চূড়ান্ত সংগ্রাম যতদূর সম্ভব পিছিয়ে দিয়ে কয়েক মাস বাড়তি সময় সংগ্রহের চেষ্টা করা যুক্তিযুক্ত ছিল দিল্লীতে ১৬ই অক্টোবর ডি. পি. ধরের কাছে এই বাড়তি সময়ের প্রয়োজন ব্যাখ্যাকালে আমি পাকিস্তানী দখল অবসানের পর সম্ভাব্য অরাজকতা ও সামাজিক হানাহানির চিত্র তুলে ধরি

 

কিন্তু কিছুদূর আলোচনার পরেই স্পষ্ট হয়, তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে যে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা অধিকতর বিব্রত ও চিন্তান্বিত, তা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বিষয়ে নয়, বরং স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এই বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা কেন তখনও সক্রিয় নয়, তাই নিয়ে তাঁদের প্রধান দুশ্চিন্তা মুক্তিসংগ্রামের এই নিশ্চলতা থেকেই উদ্ভূত মুক্তিযোদ্ধারা যদি দখলদার সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে না-ই ঘটাতে পারে, তবে কিভাবে একে বাংলাদেশের নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে বিশ্বের সম্মুখে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব? তৎসত্ত্বেও যদি ভারতীয় বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে হয় তবে কিভাবে দ্রুত বিজয় সুনিশ্চিত করা সম্ভব? এবং যে যুদ্ধ বাংলাদেশের নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভারতীয় বাহিনীর অভিযান যেখানে মন্থর ও বাধাগ্রস্ত, সেখানে কিভাবেই-বা বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ রোধ করা সম্ভব? তাদের অপর প্রধান উদ্বেগ ছিল বিগত কয়েক মাস ধরেই প্রায় অপরিবর্তনীয়-মুজিবনগর রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উপদলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বিশেষত তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে এগুলির কোনটিরই যথার্থ সমাধান নির্দেশ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না কিন্তু এই সব সমস্যা উত্থাপনের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টিই স্পষ্ট করা হয় যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে যদি না বাড়ে, তবে চূড়ান্ত সংগ্রামের কোন সময়সূচীই অনুসরণ করা সম্ভব নয়, এগিয়ে আনা বা পিছিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন কার্যত অর্থহীনতবে তিনি জানান, সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের একটি জাতীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে আনার জন্য এবং যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকৃত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ করে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক; এবং এ বিষয়ে যদি তাঁদের কোন করণীয় থাকে তবে তাঁরা তা পালন করতে সম্মত আছেন দিল্লীতে দু’দিনে ডি. পি. ধরের সঙ্গে তিন-দফা বৈঠকের পর সমস্যার উপলব্ধিকে গভীরতর করে যখন কোলকাতা ফিরে আসছিলাম তখন অধিকৃত এলাকায় ঝড়ের আগের স্তব্ধ মেঘের মত সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হঠাৎ বাতাসের দোল শুরু হয়েছিল-বাইরে থেকে যা প্রথম বুঝতেই পাওয়া যায়নি

 

২০শে অক্টোবর কোলকাতায় আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির বৈঠক শুরু হয়২০ ও ২১শে অক্টোবর দু’দিন এই বৈঠক চলার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত হওয়ায় (এবং সম্ভবত মন্ত্রিসভার সদস্যরাও তাঁদের সহগমন করায়) ২৭ ও ২৮শে অক্টোবর মুলতবি সভা অনুষ্ঠিত হয় জুলাই মাসে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির প্রথম বৈঠকের প্রায় সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে কার্যকরী কমিটির এটা ছিল দ্বিতীয় বৈঠক আওয়ামী লীগের কার্যকরী বৈঠক আরও ঘন ঘন হওয়া উচিত এই মর্মে এক দাবী আওয়ামী লীগের নেতৃমহলে বিরাজমান ছিল কিন্তু ভারতে প্রবেশের পর থেকেই শেখ মুজিবের অনুপস্থিতির ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অন্তত চারটি উপদলের যুগপৎ বিরোধিতা, দলকে বিভক্ত করার জন্য বৈদেশিক শক্তির অন্তর্ঘাতী ভূমিকা এবং প্রকাশ্য ও গোপন বিদ্রোহের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আরও ঘন ঘন কার্যকরী কমিটির বৈঠক আয়োজন করতে বা পার্টির কাজে আরও বেশী সময় বরাদ্দ করতে হয়ত তাজউদ্দিন পারতেন, কিন্তু তারপর প্রবাসী সরকারের সংগঠন ও পরিচালনার ব্যাপারে এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে রণনৈতিক আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতটুকু সময় তিনি দিতে পারতেন, অথবা মুক্তিযুদ্ধ তার ফরে কতখানি সাহায্যপ্রাপ্ত হত, তা পরিষ্কার ছিল না কিন্তু অক্টোবরের কার্যকরী কমিটির বৈঠক শুরু হবার পর প্রথম দু’দিনের আলোচনা থেকে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের বক্তব্য এবং তাঁদের পরিবেশিত তথ্যাদি মুক্তিযুদ্ধের ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার পক্ষে সহায়ক ছিল১৮৬  এতদিন যাঁরা দলীয় ও সরকারী নেতৃত্ব থেকে তাজউদ্দিনের অপসারণের জন্য প্রাকশ্য প্রচার চালিয়ে এসেছেন, তাঁদের প্রতিনিধিরাও কার্যকরী কমিটির এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তাজউদ্দিনের পদত্যাগ দাবী উত্থাপন থেকে বিরত থাকেন তাঁরা যে সংখ্যায় নিতান্ত অল্প, অন্তত এই উপলব্ধি থেকে কোন প্রকাশ্য আক্রমণ না চালিয়ে তাঁরা কৌশলের পরিবর্তন করেন এবং একটি সাবকমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন২০ ও ২১শে অক্টোবরের আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের উপর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ কতদূর সম্প্রসারিত করা যায়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব জনাব কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত এই সাবকমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়১৮৭

 

২১শে অক্টোবর কার্যকরী কমিটির বৈঠকের পর সভা মুলতবি রেখে পরদিন বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য দিল্লী যান২৪শে অক্টোবর থেকে ১৯ দিনের জন্য ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করতে চলেছেনএই সফরের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ইন্দিরা গান্ধী জানান যে, যদিও আসন্ন সফরের মাধ্যমে তিনি শান্তিপূর্ণ পথে বাংলাদেশ সমস্যার নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারসমূহকে সম্মত করানোর শেষ চেষ্টা করবেন, তবু তিনি এ সম্পর্কে বিশেষ আশাবাদী ননতিনি আরও জানান, যদি কোন সুফল না পাওয়া যায়, তবে তাঁর ফিরে আসার পর এবং বাংলাদেশে পথঘাট আরো শুষ্ক হওয়ার পর পাকিস্তানী দখলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দেখা হবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর এরূপ স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল এই প্রথমজানা যায়, তার মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্যদের কাছেও তা গোপন রাখা হয়েছিল কাজেই একাধিক কারণেই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক ছিল কিন্তু অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এই অতীব আনন্দের সংবাদ বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অপরাপর সদস্যদের অবহিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মনে করায় তাঁর কাছ থেকে সমগ্র মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিসভা থেকে আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটি এবং কার্যকরী কমিটি থেকে প্রায় সর্বসাধারণ্যে প্রচার হতে থাকে যে বিদেশ সফর থেকে ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যাবর্তনের পরই ভারত যুদ্ধ ঘোষণা করবে১৮৮  এই প্রচারের অন্যতম ফল হিসাবে অবশ্য আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির মুলতবি বৈঠকের আলোচনা আরও বেশী গঠনমূলক হয়ে ওঠে

 

দিল্লীতে সৈয়দ নজরুলের উপস্থিতিতে তাজউদ্দিন প্রথমবারের মত ইন্দিরা গান্ধীর কাছে RAW - এর সমর্থনের ফলে ‘মুজিব বাহিনী’ যে নানা বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলেছে তার উল্লেখ করেন ইন্দিরা এই অবস্থার ত্বরিত প্রতিবিধানের জন্য সভায় উপস্থিত ডি. পি. ধরকে নির্দেশ দেনডি. পি. ধর ‘মুজিব বাহিনী’কে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করার জন্য মেজর জেনারেল বি. এন. সরকারকে নিয়োগ করেনএই উদ্দেশ্যে যথাশীঘ্র কোলকাতায় এক বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়এই বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তাজউদ্দিন ও কর্নেল ওসমানী, মুজিব বাহিনীর পক্ষে তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক (আমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও শেখ মণি অনুপস্থিত থাকেন) এবং ভারতের সামরিক বাহিনীর পক্ষে মেজর জেনারেল সরকার ও ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত উপস্থিত ছিলেন আলোচনার এক পর্বে একজন যুবনেতা দাবী করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার অধিকার একমাত্র তাঁরই রয়েছেএরপর আলোচনা আর এগুতে পারেনিপরে বি. এন. সরকার কেবল যুবনেতাদের নিয়ে আলোচনার জন্য ‘ফোর্ট উইলিয়ামে’ মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন করেন কিন্তু সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার ‘একমাত্র অধিকারী’ সেই যুবনেতা ছাড়া আর কেউই হাজিন হননি কয়েকদিন বাদে যেহেতু যুবনেতাদের সকলে আগরতলায় উপস্থিত থাকবেন, সেহেতু সেখানেই তাদের সঙ্গে বি. এন. সরকারের পরবর্তী বৈঠকের সময় স্থির করা হয় কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ‘মুজিব বাহিনী’র সকল নেতা একযোগে অনুপস্থিত থাকেন; মেজর জেনারেল সরকারও এই পণ্ডশ্রম বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য জরুরী কাজে মনোনিবেশ করেন১৮৯

 

 

 

আগের অধ্যায়           পরের অধ্যায়

 

 

 

১৭৯   পরিশিষ্ট চ (view text / pdf ) দ্রষ্টব্য   Back to main text

 

১৮০   বাংলাদেশ পররাষ্ট্র বিভাগের ৭ই অক্টোবরের Memo No. 130(30)FS/MFA/71-তে কেবল আলমের অনুপস্থিতিকালে হোসেন আলীর উপর দায়িত্ব বহাল থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়   Back to main text

 

১৮১    ২১ ও ২৭শে অক্টোবর আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির সভায় আবদুল মমিন তালুকদার, শামসুল হক, নুরুল হক, আবদুল মালেক উকিল ও আবদুল হান্নান পরিবেশিত সংশ্লিষ্ট তথ্যের জন্য পরিশিষ্ট ঞ (view pdf ) দ্রষ্টব্য   Back to main text

 

১৮২   এপ্রিলে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রত্যেকেই প্রতিজ্ঞা করেন, দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত তাঁরা কেউই পারিবারিক জীবনে ফিরে যাবেন নাএই প্রতিজ্ঞা রক্ষা অন্যদের পক্ষে সম্ভব না হলেও তাজউদ্দিন তাঁর অফিসের পাশের কামরায় রাত্রিযাপন করতেন   Back to main text

 

১৮৩   পরদিন সকালে তাজউদ্দিন সংক্ষেপে এ ঘটনা আমাকে অবহিত করেনতিনি সংশ্লিষ্ট যুবকের পরিচয় গোপন রাখেন, সিকিউরিটিকে সতর্ক করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং পুনরায় এক নতুন বিতর্ক যাতে শুরু না হয়, সে জন্য এ ঘটনা সম্পূর্ণ গোপন রাখার অনুরোধ করেনফলে অক্টোবরের প্রথমার্ধে সংঘটিত এই ঘটনা সম্পর্কে কোন নোট, এমনকি এর তারিখের রেকর্ডও আমি রাখিনি। (কিন্তু প্রবাসী সরকারকে বাতিল করে ‘বঙ্গবন্ধুর মনোনীত প্রতিনিধি’ হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণের জন্য শেখ মণির অত্যুগ্র বাসনা এবং তার ফলে তাজউদ্দিন ও শেখ মণির মধ্যকার এই সব বিরোধ ও সংঘাতের জের হিসাবে ১৯৭২ সাল থেকেই মুজিব-তাজউদ্দিন সম্পর্কের বিবর্তন, ছাত্রলীগের ভাঙ্গন, ‘মুজিব বাহিনী’র অনুগত অংশ নিয়ে ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গঠন, ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠনের ফলে সেনাবাহিনীর বিরাগ উৎপাদন এবং এমনি সব ঘটনা একের ফলে আর একটি ঘটতে শুরু করে)এই গ্রন্থ রচনাকালে উপরে বর্ণিত ঘটনা সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য অনুসন্ধানের সময় আমি মাত্র দু’জন ব্যক্তির সন্ধান পাই, যাঁরা নির্দিষ্ট প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেনএকজন প্রধানমন্ত্রীর তদানীন্তন একান্ত সচিব ডক্টর ফারুক আজিজ খানথযিনি ঘটনার সম্ভবত কয়েক সপ্তাহ পরে বিষয়টি জানতে পারেন, যখন শেখ মণি তাজউদ্দিনের সাক্ষাৎপ্রার্থী হন দ্বিতীয় জন শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায়, বোধহয় তিনিই সর্বপ্রথম ঘটনাটি জেনেছিলেন কেননা তিনি প্রবাসী সরকারের সদর দফতর ৮ থিয়েটার রোডের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন   Back to main text

 

১৮৪   প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রণীত এক কর্মোদ্যোগ-পরিকল্পনার ফটোকপি (পরিশিষ্ট ট) থেকে এই সমস্যার পরিধি সম্পর্কে কিছু ধারণা গঠন করা সম্ভব   Back to main text

 

১৮৫   পরে মৈত্রীচুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়ে আরো কিছু আলোচনার পর চুক্তির একটা খসড়াও প্রস্তুত করা হয় কিন্তু নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে দিল্লীতে তাজউদ্দিনকে জানানো হয়, ভারত অবস্থানকালে এরূপ কোন চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার ফলে এমন ধারণার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক যে ভারতের চাপের মুখেই (‘under duress’) সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এই যুক্তিকে চুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনা বন্ধ হয়ে যায় পরবর্তীকালে বিষয়টি আলোচনাকালে পি. এন. হাকসার জানান, ১১ই নভেম্বর তিনি যখন স্বল্পকালের জন্য দিল্লী আসেন, তখন সংশ্লিষ্ট ফাইলটি তাঁকে দেখানো হয় এবং তাঁর ভাষায়: “I opposed signing of the proposed treaty on the ground that India would have to send in forces within Bangladesh of called upon by the latter, and also this would have compromised India’s diplomatic posture of being the most moderate element in the strife.”   Back to main text

 

১৮৬   ২১, ২৭ ও ২৮শে অক্টোবরে অনুষ্ঠিত কার্যকরী সংসদের বিভিন্ন আলোচনার সংক্ষিপ্তসারের জন্য পরিশিষ্ট ঞ দ্রষ্টব্যএই সংক্ষিপ্তসার তাজউদ্দিন আহমদের স্বহস্তে লিখিত   Back to main text

 

১৮৭   ২৭শে অক্টোবর এই সাবকমিটি তাঁদের সুপারিশে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন: “that no time should be lost in inducting effective party control in the affairs of the government which is Awami League government and in formulating policy and action programme with regard to liberation struggle....”  তাজউদ্দিন প্রশাসন বিভাগকে নির্দলীয় রাখার জন্য প্রথম থেকে যে সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন, এই সিদ্ধান্ত ছিল সেই প্রচেষ্টার বিপরীতমুখী পদক্ষেপ   Back to main text

 

১৮৮   ইন্দিরা গান্ধী এ জন্য যে তাঁর মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন, তা তিনি নিজেই নভেম্বরের মাঝামাঝি অনুষ্ঠিত পরবর্তী বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দিনকে অবহিত করেন   Back to main text

 

১৮৯   লে. জেনারেল বি. এন. সরকার, একান্ত সাক্ষাৎকার, ১০ই এপ্রিল, ১৯৭৩   Back to main text