ফিরে দেখা ১৯৭১/মুক্তিযুদ্ধ

 

মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে ২০০২ সালে আয়োজন করা হয়েছিল ফিরে দেখা ১৯৭১নামে এক আলাপচারিতাএই আলাপচারিতা চলেছিল কয়েক দিন ধরেএতে অংশ নিয়েছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, মূলধারা ৭১ বইয়ের লেখক মঈদুল হাসান এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা উইং কমান্ডার (অব.) এস আর মীর্জাতিনজনই মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেনএ কে খন্দকার উপপ্রধান সেনাপতি, মঈদুল হাসান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী এবং এস আর মীর্জা যুবশিবিরের মহাপরিচালক ছিলেনতাঁরা মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রসঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন

 

তাঁদের এই আলাপচারিতা তখন রেকর্ড করা হয়েছিলপ্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী সেই আলোচনার সম্পাদিত পূর্ণাঙ্গ অংশ প্রথম আলোর ইন্টারনেট সংস্করণে প্রকাশিত হলো

 

এস আর মীর্জা: ১৯৭১ সালের মার্চে আমি লক্ষ করলাম, পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে২ মার্চ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বিমানবাহিনীর অফিসে গিয়ে আমি জানতে চেষ্টা করি কী হচ্ছে, কী হতে চলেছেআমি কথা বলি এ কে খন্দকারের সঙ্গেতিনি আমার জায়গাতেই বদলি হয়ে এসেছিলেনআমি তাঁর বাসায় গিয়েছিলামতাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় আমি লক্ষ করলাম, তিনি খুবই আপসেটতিনি আমাকে লনে যেতে বললেনআমি বুঝলাম, তিনি একান্তে আমাকে কিছু বলার জন্য লনে যেতে বলেছেন, যাতে অন্য কেউ শুনতে না পায়ওখানে গিয়ে তিনি আমাকে কয়েকটি বিষয় অবহিত করলেনএর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণএক. নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের হাতে পাকিস্তানিরা কোনোক্রমেই ক্ষমতা হস্তান্তর করছে নাদুই. সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১২টি ট্যাংক ঢাকার কুর্মিটোলায় নিয়ে এসেছেতিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আওয়ামী লীগের কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতি আছে কি না এবং তা জানার জন্য আমাকে বললেনযুদ্ধ বলতে ওই বাঁশের লাঠি দিয়ে নয়! অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ

তখন আমি আওয়ামী লীগের নেতা পর্যায়ের কাউকে চিনতাম নাআমি আমার এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে যারা এমএনএ, এমপিএ নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁদের কয়েকজনকে চিনতামছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা ছিলেন আমার কাজিনওই অবস্থায় আমি তাঁকে গিয়ে বললাম আওয়ামী লীগের যুদ্ধপ্রস্তুতি সম্পর্কে আমাকে অবহিত করার জন্যদুই দিন পরে তিনি আমাকে জানালেন, আওয়ামী লীগের কোনো প্রকার যুদ্ধপ্রস্তুতি নেইএমনিতেই আন্দোলন চলছেতখনো ওসমানী সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়নিতিনি ঢাকাতেই ছিলেনআমি রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছিলাম স্বাভাবিকভাবেইআওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেতারা সরকার গঠন করবে-এটা সবার কাছে প্রত্যাশিত ছিলযেকোনো গণতন্ত্রমনা মানুষের এটা কাম্যএটা না করে পাকিস্তান সরকার যে পন্থা বেছে নিল, তা সম্পূর্ণ নির্বুদ্ধিতার শামিলওরা বুঝতে পারেনি যে সত্যিকার অর্থে অবস্থা কী এবং দেশে কী হতে যাচ্ছে

এর মধ্যে আমার এক ভাতিজা একদিন ফোন করে আমাকে বলল, ২২ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক লোকদের একটি মার্চপাস্ট অর্থা শোভাযাত্রা হবে বায়তুল মোকাররমে, কর্নেল ওসমানী সেখানে থাকবেনআমি যেন উপস্থিত থাকিআমি সেখানে গেলামগিয়ে দেখলাম কর্নেল রব আছেন, জেনারেল মজিদ আছেনআমরা তিন লাইনে দাঁড়ালামআমি একটা লাইনে ছিলামকর্নেল ওসমানী এসে আমাকে বললেন, বিমানবাহিনীর মধ্যে আপনি সবচেয়ে সিনিয়রআপনি বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেনএতে আমি রাজি হলামশোভাযাত্রা শেষ করে আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গেলামবঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের দেখা হলো

তখন আমি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে পরিস্থিতি, বিশেষত পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবিলা করার বিষয়ে কথা বললামআমি ওসমানীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেনতাঁর কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেল নাআমি তাঁকে বললাম, অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করা যাবে নাতাদের সশস্ত্রভাবে মোকাবিলা করতে হবেকিন্তু এজাতীয় সামরিক পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের ছিল কি না এটা ওসমানী সাহেব আমাকে বলতে পারেননি

আসলে ইতিহাসের অনেক কথাই বলা বা লেখা যায় নাহিস্ট্রি অ্যাজ রিটেন ইজ নট দ্য হিস্ট্রি হ্যাজ হ্যাপেনড, ২২ মার্চের শোভাযাত্রা শেষে আমি আমার কাজিন রবের বাসায় গিয়েছিলামসেক্রেটারি রবতিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন সাহেবকে খুব ভালোভাবে জানতেনআমি রব ভাইকে বললাম, আপনি রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন বা এ বিষয়ে কী ভাবছেন? রব সাহেব বললেন, গান্ধীও ১৯২০ সালের দিকে অসহযোগ আন্দোলন করেছিলেন, কিন্তু সেটা ননভায়োলেন্ট থাকেনিআমি তখন বললাম, আপনি গিয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলেনপাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনকআমি তখনই বুঝেছিলাম, এখানে পাকিস্তানি বাহিনী একটা ভয়ানক ধ্বংসলীলা চালাবেএই ধ্বংসলীলা হবে অকল্পনীয়-হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের মতোতাই গিয়ে দেখুন, শেখ সাহেব কী ধরনের প্রস্তুতির কথা ভাবছেনরব সাহেব আমাকে পরদিন সন্ধ্যায় আবার তাঁর বাসায় যেতে বললেন

আমি পরদিন সন্ধ্যায় রব সাহেবের সঙ্গে দেখা করলামরব সাহেব বললেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেননিতাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছেতিনি বলেছেন, ‘এসব আমি জানিসেদিন আমি সোবহানবাগ দিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় দেখা হলো এ কে এম মাহবুবুল ইসলামের সঙ্গেতিনি পাবনার এমপিএ ছিলেনসাবেক নেভাল কমান্ডারতিনি আমাকে কাছেই একটি বাড়িতে নিয়ে গেলেনওই বাড়ির দোতলায় উঠে দেখি মনসুর আলী সাহেব বসে আছেনসঙ্গে আছেন সিরাজগঞ্জের এমপিএ হায়দার সাহেবআমি তাঁকে বললাম, বঙ্গবন্ধু সব নেতাকে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার কথা বলেছেন, অথচ আপনি এখনো এখানে বসে আছেন! কেননা, আমি জানতাম, যেকোনো মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করতে পারেআমাদের বসে থাকার সময় নেইমনসুর আলী সাহেবকে আমার মতামত বললামতিনি কিছু বললেন নাআমি চলে এলাম

 

মঈদুল হাসান: ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে থেকেই পাকিস্তান তার ট্রুপস বিল্ডআপ শুরু করেঅনেকে মনে করত, একটা বিশাল রক্তপাত হতে চলেছে এখানেএই সময়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলিআসাফ-উদ-দৌলার (সিএসপি) বড় ভাই মেজর মসিহ-উদ দৌলা ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার অফিসে জেনারেল স্টাফ ছিলেনকোর কমান্ডারের জি-২, ইনটেলিজেন্সের দায়িত্বেওদের আরেক ভাই আনিস-উদ দৌলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আনোয়ারুল আলমমার্চের ৩ তারিখে ওদের কাছ থেকে পাকিস্তানি আর্মির প্রস্তুতি সম্পর্কে গোপন নানা তথ্য জানতে পারার পর আনোয়ারুল আলম আমার সঙ্গে দেখা করেনতথ্যগুলো উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌঁছানো দরকার বলে তথ্য সরবরাহকারীরাই তাঁকে অনুরোধ করেছেন বলে তিনি জানানপাকিস্তানি আক্রমণের প্রস্তুতি এতটাই এগিয়েছে যে এর মধ্যেই রংপুর থেকে ট্যাংক রেজিমেন্ট নিয়ে আসা হয়েছে এবং তাতে রাবার বেল্ট লাগানো হচ্ছে ঢাকা শহরের পথে অপারেশন চালানোর উপযোগী করেআনোয়ারুল আলম সেদিন আমাকে সংশ্লিষ্ট মহলে খবরগুলো পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেনতিনি কেবল আমার দীর্ঘদিনের বন্ধুই ছিলেন না, আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এক ছিল এবং তাঁর সততা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় আমার আস্থা ছিলকাজেই তাঁর প্রস্তাবে আমি রাজি হইতবে বলি, এসব খবর হয়তো অন্যভাবেও পৌঁছে যাবে, বরং আপনার সূত্রকে জিজ্ঞাসা করুন, পাকিস্তানের আসন্ন হামলা ঠেকানোর মতো কোনো উপায় আছে কি না

আলম পরের দুই দিন ওই কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েনবিরাট ঝুঁকি নিয়ে ওদিকে যোগাযোগ করেন অন্তত দুবার, আবার এদিকে কথা হয় অনেকবার আমার সঙ্গেও৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমার জিজ্ঞাসার পুরো উত্তর পাওয়া যায়তিনি জানালেন, পাকিস্তানি আক্রমণ প্রস্তুতি বন্ধ করা যেতে পারে কেবল সামরিক পথেইএখনো এই প্রদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) বাঙালি সৈন্যের সংখ্যা অবাঙালি সৈন্যদের থেকে বেশিতা দিয়ে গোদনাইল জ্বালানি তেলের ডিপো ধ্বংস করা, ঢাকা বিমানবন্দর অকেজো করে ফেলা এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দখল করা-এই তিনটি কাজ একযোগে করা সম্ভবএগুলো হলেই পাকিস্তানিরা খুব অসুবিধায় পড়বেএই কাজগুলো করার জন্য বাঙালি ফোর্স পাওয়া যাবে কি এবং কীভাবে পাওয়া যাবে, তাই ছিল আমা পরের প্রশ্নসেই উত্তরও আলম নিয়ে আসেনফোর্স আছে, তবে আর্মির লোকদের মুভ করাতে হলে একটা অর্ডার লাগে, ওপরের লেজিটেমেট অর্ডার ছাড়া তারা মুভ করতে পারে নাসেই লেজিটিমেসি শেখ মুজিবের এখনো নেই, তবু বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার ফলে তিনি একটা মরাল অথরিটি পেয়েছেনতার ভিত্তিতে তিনি যদি অর্ডার দেন ক্লিয়ারকাট, তবে বাঙালি ফোর্সরা অস্ত্র ধরতে রাজি হবে, যেমন সিভিল সার্ভিসের সবাই তাঁকে মেনে নিয়েছেনএকই সূত্র থেকে গোটা প্রদেশের একটা সামগ্রিক অবস্থা আমার জানা ছিলউভয় পক্ষের তুলনামূলক সৈন্যসংখ্যা জানার জন্য একটা ম্যাপ বা নকশা আমি চেয়েছিলামসেটাও পাঠানো হবে বলা হয়েছিলআলমের সঙ্গে তারপর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মেজর মসিহ-উদ দৌলা সেই ম্যাপ বানিয়ে তাঁর বোন প্রখ্যাত গায়িকা ফিরোজা বেগমের হাতে ৭ মার্চ সকালে সরাসরি শেখ মুজিবের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে অনেক বছর বাদে প্রেরকের কাছেই আমি জানতে পারিকিন্তু সেটার তখন আর প্রয়োজন পড়েনি

আমি ওই দিনই অর্থা ৫ মার্চ রাত সাড়ে নয়টায় গেলাম শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতেতাঁর সঙ্গে আমার ১০-১১ বছরের পুরোনো পরিচয়১৯৬২ সালে আমি শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে সাড়ে চার মাস জেলে ছিলাম, একই ২৬ সেলেতারপর আমাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি৫ মার্চ রাতে যখন তাঁর কাছে গেলাম, তখন আওয়ামী লীগের নেতারা সদলবলে বেরিয়ে আসছেনআবদুল মোমেন এগিয়ে এলেন আমাকে ভেতরে নিয়ে যেতেতাঁকে বললাম, আমি একা দেখা করতে চাইকারণ এখানে একজন সার্ভিং অফিসারের (মসিহ-উদ দৌলা) নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছেতিনি গেলেন নাকিন্তু রেহমান সোবহান এসব কিছু না শুনেই সোসাহে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেনতবে সে সময়ে রেহমান সোবহান বাংলা ভাষাটা ভালো বুঝতেন নাসেটাই আমার ভরসার কথা

আমি শেখ মুজিবকে মেজর দৌলার দেওয়া তথ্য, পাকিস্তানের আক্রমণ প্রস্তুতি, ট্যাংক বহরকে ঢাকা শহরে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করার সংবাদ, এমনকি তথ্যদাতার পারিবারিক পরিচয়ও প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলামআমি যা অনুমান করেছিলাম, তিনি শুনে বললেন, আমি সব জানি! আমি তাঁকে বললাম, আরও একটা সংবাদ আছে দেওয়ারআর্মির ওই সূত্রকে আমি জিজ্ঞাসা করেছি, কী করে পাকিস্তানিদের ঠেকানো যায়? উত্তরে জানিয়েছে, তিনটি স্পেসিফিক অপারেশন করতে হবে-গোদনাইল পিওএল ডিপো অকেজো করা, ঢাকা এয়ারপোর্ট ব্যবহারের অনুপযোগী করা আর চট্টগ্রাম পোর্ট দখল করাএগুলো করার মতো বাঙালি ফোর্সও আছে, তাদের পাওয়াও যাবে বলে শুনেছি, তবে তার জন্য আপনাকে পরিষ্কার নির্দেশ দিতে হবেএর ফলে অন্যান্য জায়গাতেও পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়বে তাড়াতাড়িই-ভারত ওভারফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এবং ঢাকা এয়ারপোর্ট ও চট্টগ্রাম পোর্ট বন্ধ করে দেওয়ার পর রি-ইনফোর্সমেন্ট পাকিস্তানের জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবেআমার সব কথা শুনে একটু চুপ থেকে শেখ মুজিব জিজ্ঞেস করলেন, তাজউদ্দীন জানে ব্যাপারটা? বললাম, না কেবল আপনিই জানতে পারলেন, সেটাই ছিল তাদের অনুরোধতাহলে আপনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে আলাপ করে নেন, শেখ মুজিব এই কথা বলে আলোচনা শেষ করলেন

আমি সঙ্গে সঙ্গে ওখান থেকে বেরিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাজউদ্দীন আহমদের বাড়িতে যাইতাঁকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলিতার পরও অনেক প্রশ্ন করে আরও বিষয় তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেনসবশেষে জিজ্ঞাসা করলেন, মুজিব ভাইয়ের কথা শুনে আপনার কী মনে হলো? তিনি কেন আপনাকে আমার কাছে পাঠালেন? আমি বললাম, তিনি হয়তো এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান নাআবার খবরটা অগ্রাহ্যও করতে পারলেন নাতাই আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, দায়দায়িত্ব এখন আপনারতাজউদ্দীন হেসে বললেন, এই তো আপনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুঝে গেছেন! এমনিভাবে ওই রকম একটি উদ্যোগের সম্ভাবনা তখন বাদ পড়ে

আরও অনেক জানা ও অজানা ঘটনা আজও স্বাধীনতার এত বছর পরও, পক্ষপাতহীনভাবে এবং সমগ্র ঘটনার অংশ হিসেবে দেখা হয় না৭ মার্চ শেখ মুজিবের এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামএই বহুল প্রচারিত উক্তির কথাই ধরা যাকমার্চের প্রথম পাঁচ দিনে পূর্ববাংলার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের তীব্রতা দেখে ইয়াহিয়া অপ্রত্যাশিতভাবেই আবার ঘোষণা করেন, ২৫ মার্চ থেকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবেএটা তাচ্ছিল্য করার বিষয় ছিল নাকাজেই ৭ মার্চের জনসভায় শেখ মুজিব জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার শর্ত হিসেবে তিনটি দাবি তোলেন-কারফিউ তুলে নিতে হবে, মার্শাল ল প্রত্যাহার করতে হবে এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক হত্যা ও নির্যাতনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবেতিনি এ-ও জানতেন, এ দেশের অনেক মানুষ স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে জনসভায় এসেছেকিন্তু পরিস্থিতি সেই ঘোষণার অনুকূলে ছিল নাপর্যাপ্ত সামরিক প্রস্তুতি না নিয়ে এ ধরনের ঘোষণা বিরাট বিপদ ডেকে আনতে পারতএই নাজুক অবস্থায় মানুষকে সংগ্রামমুখী করে রাখার উদ্দেশে এবারের সংগ্রামের চরিত্র উদ্দীপ্তভাবেই তিনি তুলে ধরেনসেই ঘোষণাকে সে সময় যেভাবেই গ্রহণ করা হয়ে থাকুক, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা শুরু হওয়ার পর মানুষ এই আলোচনার ফলাফলের দিকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেপাকিস্তানি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পরে-শেখ মুজিবের কণ্ঠে স্পেসিফিকভাবে কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা না থাকায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ৭ মার্চের ঘোষণাকে প্রত্যহ কয়েকবার করে বাজানো হয়েছেতারও অনেক বছর পরে উত্তরসূরিদের রাজনীতি আবার সেই কথা দুটি সামনে এনে তা স্বাধীনতা ঘোষণার সমার্থক প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেকিন্তু যে পটভূমিতে, যে বাস্তবতা বোধ থেকে এবং যেভাবে ওই বক্তৃতা দেওয়া হয়েছিল, তার যথার্থতা ভাবাবেগবর্জিতভাবে এ দেশে কমই আলোচিত হয়েছেওটা তাঁর অনুসারীরাও করেননি, বিরুদ্ধবাদীরাও না

১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেছাত্রলীগের ছেলেরা আপসহীনভাবে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম জোরদার করে তুলেছিল নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়িয়েঅন্যদিকে নির্বাচিত এমএনএগণ পার্লামেন্টে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, মোটামুটিভাবে সম্মানজনক আপস প্রস্তাবের ভিত্তিতেকিন্তু সাধারণ নির্বাচনে নিজে অত বড় একটা মেজরিটি পাওয়ার পর, ছয় দফাকে কমিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা গ্রহণ করলে, তা তাঁর জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার নামান্তর হবে বলে তিনি (শেখ মুজিব) মনে করতেনঅন্যদিকে ইয়াহিয়া ছয় দফার সমর্থক সদস্যদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকার বিনষ্ট করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেনতা প্রতিরোধ করার জন্য সত্যিই একমাত্র উপায় ছিল, মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যা ও সামর্থ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যুত্থান ঘটানোর ব্যবস্থা করাযে পথ শেখ মুজিব গ্রহণ করেননিএকটা অহিংস অসহযোগ আন্দোলন নিরস্ত্র দেশবাসীকে যত দূর নিয়ে যাওয়ার, তা নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কেবল সে পথে যে ক্ষমতার হস্তান্তর সম্ভব নয়, তা এখন আর অস্পষ্ট নয়তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কিসের ভরসায় মুজিব ১৫ মার্চ থেকে ঢাকায় ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসতে সম্মত হলেন? কারা তাঁকে আস্থা জুগিয়েছিল, সেই সামরিক জান্তা এক দিনের জন্যও সৈন্য ও সমর-সম্ভার নিয়ে আসা থেকে বিরত হয়নি, তারা তাঁকে কনফেডারেশন দেবে?

এখনো এসব বিষয়ে যথেষ্ট আলোকপাত হয়নিসম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১৯৭১ সালের যেসব গোপন দলিলপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেছে, তার মধ্যে কিছু সূত্রের সন্ধান পাওয়া যায়সম্ভব ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকার আস্থাভাজন পাকিস্তানি আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে শেখ মুজিব বলেন, তিনি আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে দেখা করতে চাতারাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে এরপর এই অঞ্চল নিয়ে আমেরিকার তপরতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়তাদের তপরতার বিভিন্ন দিক-কলকাতায় প্রবাসী সরকারের মধ্যে আন্তর্জাতিক তপরতা থেকে শুরু করে যুদ্ধের শেষ অবধি সামুদ্রিক তপরতার অনেক কথাই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছেকিন্তু ২৬ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের দুই দিন আগে পর্যন্ত কনফেডারেশনের আইন তৈরির মায়াময় জগ সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা আজও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত

স্বাধীনতা ঘোষণার ব্যাপারে পলিটিক্যাল লিডারশিপ কেন একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি, সেটা ভাবাবেগমুক্তভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন

এ প্রসঙ্গে আর একটি ছোট ঘটনার কথা বলিসে দিন ২২ মার্চসন্ধ্যায় ন্যাপপ্রধান আবদুল ওয়ালি খান, গাউস বক্স বেজেঞ্জো, ওদিকের এবং এদিকের আরও কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার বাসায় নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এসেছিলেনস্থানীয় নিমন্ত্রিতদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে জীবিত ব্যক্তি হিসেবে একমাত্র বদরুদ্দীন উমরের কথাই মনে করতে পারছিওয়ালি খান এসেই বললেন, আমি আজ সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করি, কী তোমার সর্বশেষ অবস্থা? ইয়াহিয়া বললেন, আমি যেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেছি, সেখান থেকে বেরুতে হলে, আই হ্যাভ টু শ্যুট মাই ওয়ে থ্রুআমি খবরটা শেখ মুজিবকে দেওয়া দরকার মনে করে গেলাম তাঁর কাছেতাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, জানেন, ইয়াহিয়া কী করতে পারে? এ কথা বলতেই শেখ সাহেব বললেন, হি উইল হ্যাভ টু শ্যুট হিজ ওয়ে থ্রুওয়ালি বললেন, ইয়াহিয়া খানের কথা হুবহু শেখ মুজিবের মুখে শুনে থ বনে গেলামতিনি আরও বললেন, তাহলে ওদের দুজনার মধ্যে আগেই এ কথা হয়েছে

অন্যদিকে আমেরিকানরাও জানতপ্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ১০ মার্চ ঢাকায় আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড শেখ মুজিবের এক গোপন প্রতিনিধি আলমগীর রহমানকে প্রথম খবরটা জানান যে ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া ঢাকায় আসছেন মুজিবের সঙ্গে আলোচনার জন্যইয়াহিয়া ও মুজিবের বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য তাঁর একটা পরিকল্পনাও আছে, আর্চার ব্লাড সে কথাও স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেনকিন্তু সেই গোপন পরিকল্পনা আজও অবমুক্ত হয়নিবস্তুত ১০ মার্চের পর থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ দিনের কোনো দলিলই এ পর্যন্ত প্রকাশিত না হওয়ায় ওই দুঃসময়ে তাদের ভূমিকা কী ছিল, কীভাবে ও কাদের তারা প্রভাবিত করেছিল, সে ইতিহাস আপাতত অজ্ঞাত

দৃশ্যত ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুজিব তাঁর সহকর্মীদের বিভিন্ন জায়গায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন, আত্মগোপন করার কথা বলেন, কিন্তু তিনি নিজে কী করবেন বা কোথায় যাবেন-সে কথা কাউকে বলেননিতিনি এটাও কাউকে বলে যাননি যে তাঁর অনুপস্থিতিতে কে বা কারা এই সংগ্রামের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেনআওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটা বিষয় আমি দেখে এসেছিযৌথ নেতৃত্ব বলে কার্যকর কিছু ছিল নাসাংগঠনিক কাজকর্মে চেইন অব কমান্ড বলে কিছুতে তারা বিশ্বাস করে নাযিনি নেতা, তিনি সমস্ত ক্ষমতার এবং সকল মূল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারীঅন্য যাঁরা নেতা থাকেন, প্রধান নেতা তাঁদের সঙ্গে বাইলেটারলি ডিল করেনএর সুবিধা-অসুবিধা দুই-ই থাকেঅসুবিধা হলো, যখন প্রধান নেতা থাকেন না, তখন অন্য নেতারা সবাই সবার সমকক্ষ মনে করেন, ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়শেখ সাহেব ধরা পড়লেন, এখানে বিশাল আক্রমণে নিরীহ লোক মরতে শুরু করল, যে আক্রমণের পূর্বাভাস এক দিন আগেও কেউ দেয়নিআওয়ামী লীগের সবাই পালিয়ে গেল, দেখাদেখি অন্য দলের লোকেরাওতারপর আক্রান্ত উপদ্রুত সাধারণ মানুষ নরঘাতক পাকিস্তানি আর্মির আক্রমণে ক্রমে সবার আশ্রয় হলো এক অজানা পরিবেশেবাঙালি সৈন্যরা প্রতিরোধের লড়াইয়ে নামল, প্রবাসে সরকারও গঠিত হলো তাজউদ্দীনের বিচক্ষণতা ও একাগ্রতার ফলেভারত উত্তরোত্তর অধিকতর রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিযুক্ত করলসবই হলোযেটা হলো না, সেটা সেই নেতৃত্ব সমস্যার সমাধাননেতৃত্বের দায়িত্ব তো শেখ মুজিব কাউকে দিয়ে যাননি, তাহলে তাজউদ্দীন কেন? সবাই ভেবেছে, আমিও হতে পারি শাসনক্ষমতার প্রধানতম ব্যক্তিএই ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন অবধি চলে

পলিটিক্যাল লিডারশিপের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা প্রভাবিত করে বাংলাদেশ আর্মির লিডারশিপ স্ট্রাকচারকেওযদি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর শৃঙ্খলা বজায় থাকত, তাহলে তাজউদ্দীন পারতেন বাংলাদেশ ফোর্সেসকে অনেক সক্রিয় ও সংহত করে তুলতে, মুক্তিযুদ্ধের গতিবেগ বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলতেতিনি সঠিক মনোভাবই প্রকাশ করতে পারতেন, যখন জুলাই মাসে সেক্টর কমান্ডারদের বৈঠকে ওসমানীকে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি উঠেছিল প্রায় সর্বসম্মতভাবে, একজন সেক্টর কমান্ডার ছাড়াএঁদের যুক্তি ছিল-ওসমানী অত্যন্ত বয়স্ক, গেরিলাযুদ্ধের রীতিনীতির সঙ্গে অনভ্যস্ত এবং দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের ব্যাপারে অত্যন্ত রিজিডতাঁকে বরং দেশরক্ষামন্ত্রীর মতো একটা সম্মানজনক পদে বসিয়ে দেওয়া যাকযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হোক সমস্ত সেক্টর কমান্ডার কর্তৃক গঠিতব্য ওয়ার কাউন্সিলের হাতেবাংলাদেশ ফোর্সেসে কর্মরত সিনিয়র মোস্ট অফিসার গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে এই কাউন্সিলে প্রধান করার প্রস্তাব হয়মেজর জিয়া এই প্রস্তাব নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করেও তুলেছিলেন এবং ওসমানী তা জানামাত্র পদত্যাগ করে যুগপ ইমোশনাল ও পলিটিক্যাল সমস্যা সৃষ্টি করেন

তাজউদ্দীনের পেছনে যদি মন্ত্রিসভার সমর্থন থাকত, তাহলে এই প্রস্তাবকে তিনি যুক্তিসংগত বলেই মেনে নিতেনএটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছিতিনি জানতেন যে ওসমানী সম্পর্কে যদি কিছু বলা হয়, তাহলে সেটা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চলবেএই প্রচারে একদিকে তাঁর কেবিনেট সহকর্মীরা, অন্যদিকে সবচেয়ে ব্যাপক প্রচারে অংশ নেবেন মুজিব বাহিনীর নেতারা

 

এ কে খন্দকার: মঈদুল হাসান সাহেব একটা কথা বললেন যে, প্রথম দিকেই যখন পাকিস্তানিরা আর্মস বিল্ডআপ করতে আরম্ভ করল, সেই সময় আমি মোস্ট সিনিয়র অফিসার ছিলাম ঢাকায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অর্থা পূর্ণ কর্নেল, যা বেশ বড় পদ ছিল সে সময়সে কারণে যেকোনো স্থানেই আমি যেতে পারতামআমি মার্চে নয়, ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেখছি এই বিল্ডআপ চলছে এবং এই বিল্ডআপের কথা আমি উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজাকে জানাই এবং তাঁদের বলি, এই সংবাদ যেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে জানানো হয়আমি তাঁদের বলেছি, কীভাবে প্রতিদিন ট্রুপস আসছে, কীভাবে কমান্ডো আসছে, কীভাবে আর্মস অ্যামুনেশন আসছে-এসব কথাই বলার জন্য তাঁদের বলেছিলামতাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে আমি জানিমঈদুল হাসান সাহেব বললেন গোদনাইলের কথাআমার স্ত্রীর বড় বোন সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেনতিনি খুবই উসাহী ছিলেন রাজনীতির বিষয়েতাঁর মাধ্যমে আমি বলে পাঠিয়েছিলাম যে গোদনাইলের তেল ডিপোতে কিছু করা যায় কি নাআমি এস আর মীর্জাকেও বলেছিলাম বিষয়টি

 

এস আর মীর্জা: এ কে খন্দকার সাহেব আমাকেও বলেছিলেন গোদনাইলে সরকারি তেল ডিপোতে একটা কিছু করার জন্যআমি এ সংবাদ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলামওরা করল কি! ছোট ট্রেঞ্চ খুঁড়েছিল পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য, এর বেশি কিছু তারা করতে পারেনি

 

এ কে খন্দকার: আমি এস আর মীর্জাকে বলেছিলাম গোদনাইল থেকে আসার রাস্তাটা এমনভাবে কেটে বন্ধ করতে, যাতে পাকসেনারা সেখান থেকে জ্বালানি তেল না আনতে পারেতখন ইন্ডিয়া পিআইএকে অনুমতি দিচ্ছিল না সরাসরি ভারতের ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসারফলে শ্রীলঙ্কা হয়ে আসতে হতো পাকিস্তানি প্লেনকেযে কারণে পাকিস্তানিদের জ্বালানি তেলের প্রয়োজন বেশি ছিলসে জন্য আমরা জ্বালানি তেল আনাটাকে যদি বাধাগ্রস্ত করতে পারি-অবশ্য একটা রাস্তা কাটলে সেটাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিক করা যাবে, তবে একটা ঠিক করলে পুনরায় আর একটা জায়গায় কাটা সম্ভব ছিল-এভাবে হ্যারাস করা গেলে পাকিস্তানিদের কিছুটা হলেও অসুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব হতো

আমি এখানে আরেকটি কথা না বলে পারছি না, যুদ্ধের শেষ দিকে আমরা ঠিক করেছিলাম যে বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স যখন অপারেট করবে, তখন তাদের প্রধান টার্গেট হবে গোদনাইলের জ্বালানি তেল ডিপো এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গা জ্বালানি তেল ডিপোএই দুটোকে ধ্বংস করা গেলে আর্মি মুভমেন্ট প্রায় বন্ধ হয়ে যাবেকারণ, জ্বালানি তেল ছাড়া তাদের মুভ করা সম্ভব নয়১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ওই দুটো জ্বালানি তেল ডিপো আমাদের নবগঠিত বিমানবাহিনী এমনভাবে ধ্বংস করেছিল যে পতেঙ্গার লোক যারা সেদিন সেই ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিল, তাদের জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, কী ভয়াবহ ছিল সেদিনের সেই বিমান আক্রমণএত বড় আগুন তারা জীবনে দেখেনি

 

মঈদুল হাসান: মার্চের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি ফোর্সেস যা ছিল, তা দিয়ে সেই সময় কী এমন আক্রমণ করা যেত বলে আপনি মনে করেন?

 

এ কে খন্দকার: এ সম্পর্কে অবশ্য যথাযথ উত্তর দেওয়া মুশকিলতবে এ জাতীয় আক্রমণ অনেক জিনিসের ওপর নির্ভর করেআমার মনে হয়, মার্চের প্রথম দিকে যখন পাকিস্তানিদের ট্রুপস তেমন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেনি, তখন যদি প্রিয়েমটিভ অ্যাটাকের কথা চিন্তা করা হতো, তাহলে এখানে যাঁরা বাঙালি অফিসার ছিলেন, তাঁদের সবাই এগিয়ে আসতেনআমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম, তাঁরা প্রত্যেকে ছিলেন ডিপলি কমিটেড ফর বাংলাদেশআমি তাঁদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছিলামসেই সময় আমাদের অর্থা বিমানবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে পাকিস্তান বা অন্য কিছু ভাবনার মধ্যেই ছিল না বাংলাদেশ ছাড়াতখন যদি উদ্যোগ নেওয়া যেত, তাহলে আমাদের একটা সুযোগ ছিল-টু ভ্যালুয়েট দ্য সিচুয়েশন ইন টার্মস অব দেয়ার স্ট্রেংথ, ইন টার্মস অব আওয়ার স্ট্রেংথ, ইন টার্মস অব আওয়ার টোটাল পপুলার সাপোর্টএসব দিক থেকে আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম যে প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইকটা কীভাবে করব বা করা যায় কি না, করলে আমাদের সম্ভাবনা কতটুকুযদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে আমি বলব, প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইক করার সম্ভাবনা প্রচুর ছিল এবং এই আঘাতে আমাদের বিজয়ের সম্ভাবনাই ছিল বেশি

 

এস আর মীর্জা: আমার তো সন্দেহ হয় এই জন্য যে এটা করতে হলে প্রথমে বিষয় সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হবে-যেখানে যেখানে বাঙালিরা আছেএ কাজটি যদি সফলভাবে করা সম্ভব হতো এবং তারা যদি সবাই একত্রে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারত, তাহলেই কেবল এটা সম্ভব ছিল

এ প্রসঙ্গে আমি আর একটি কথা বলতে চাইলে. হাফিজ, যিনি প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন, তিনি এবং তাঁর বাহিনী ২৫ মার্চে যখন পাকসেনাদের হাতে আক্রান্ত হয়, তখন লে. হাফিজ কোনো রকমে আত্মরক্ষা করে যশোর সেনানিবাস থেকে পালিয়ে আসতে সমর্থ হনকিন্তু তাঁর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিল পাকিস্তান পক্ষকেই সমর্থন দেন, মুক্তিযুদ্ধে যাননিদেশ স্বাধীন হওয়ার বহু বছর পর আমি রেজাউল জলিলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন নাতিনি জানালেন, ২৫ মার্চের কয়েক দিন আগে কর্নেল ডা. হাই ঢাকায় এসেছিলেনতাঁকে কর্নেল জলিল বলেছিলেন, অনুগ্রহ করে আপনি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা করবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, ‘আমাদের কী করা উচিতকর্নেল ডা. হাই যখন ফিরে গেলেন যশোরে, তখন নাকি লে. কর্নেল জলিল কর্নেল হাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কর্নেল ওসমানী প্রসঙ্গেকর্নেল ডা. হাই তখন ওসমানীর ভাষ্য জানালেন এভাবে: টেল জলিল, নট টু প্রিসিপিটেট (চবপরঢ়রঃধঃব) ম্যাটার এনি ফারদার-এর অর্থ কী দাঁড়াল? অর্থা কর্নেল ওসমানীর কোনো ধারণাই ছিল না কী হতে যাচ্ছেঅথবা কর্নেল ওসমানী এমন ধারণাও করতে পারেন যে একটা রাজনৈতিক সমাধান হতে যাচ্ছে

 

এ কে খন্দকার: প্রিয়েমটিভ স্ট্রাইক হলে কী হতো? আমি কিছু কথা বলেছি এ বিষয়ে, আরও কিছু কথা যোগ করতে চাইআঘাত করলে কী হতো, আর কী হতে পারত-সবই তো আমরা ধারণা করছি মাত্রতবে এটাও একটা সম্ভাবনা ছিল, যেমন চট্টগ্রামে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ছিলেন, লে. কর্নেল মাসুদ ছিলেন দ্বিতীয় বেঙ্গলে, যশোরে লে. কর্নেল রেজাউল জলিল ছিলেন-এমন অনেক বাঙালি অফিসার, সেনা, স্টাফ ছিলেনতাঁরা যদি একটা রাজনৈতিক নির্দেশ পেতেন যে আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে, তাহলে আমাদের লোকবল যে কত বেড়ে যেত, তা আজ ভাবতেও বিস্ময় জাগেআবার এ কথাও আমি বলব যে আমরা যদি প্রথম পর্যায়েই সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালি অফিসার-সেনাদের একত্রে পেতাম, তাহলে আমাদের যে অপ্রস্তুত অবস্থা, বিশৃঙ্খল-বিচ্ছিন্ন অবস্থা, সেটা থাকত না এবং আমরা আরও ভালো করতে পারতাম

 

মঈদুল হাসান: আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ দিতেন, তবে তার ফল সিভিল অফিসারদের মতোই হতো বলে আমার ধারণা হয়েছিলঅ্যাটলিস্ট দ্যাট ওয়াজ মাই আরগুমেন্ট টু তাজউদ্দীন আহমদ, যাঁর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয় ৯ অথবা ১০ মার্চেতিনি সেদিন আমার বাসায় এসেছিলেন রাতের বেলায় কিছু খবর নেওয়ার জন্যসেই সুযোগে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আগের দিন যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, তার কোনো অগ্রগতি আছে কি নাতিনি বললেন, না নেই, শুধু একবার মুজিব ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন যে আমি দেখা করেছি কি না, আর কিছু নয়আমি তখন তাঁকে বলেছিলাম, আপনারা অযথা কালক্ষেপণ করছেনআপনাদের সিভিল অফিসাররা যেমন আপনাদের কথা মানছেন, বাঙালি আর্মি অফিসাররাও তেমনি আপনাদের কথা শুনবেনভারত তার দেশের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি বিমান যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে-এই সুযোগের দ্রুত সদ্ব্যবহার আপনাদের করা উচিতঅবশ্য এসব কথা এখন বলে লাভ নেইকারণ, সবই ছিল ধারণাগত বিষয়, যা তখন যাচাই করা উচিত ছিল

 

এ কে খন্দকার: ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়কিন্তু তারও আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে আরও জোরদার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জোর তপরতা-এ দুটি বিষয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সদস্যরা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেনআন্দোলন জোরদার হওয়ার পটভূমিতে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক যুদ্ধতপরতার মুখে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা উকণ্ঠিত হয়ে পড়েন এবং তাঁরা দেশের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে বুঝতে পারেনতাঁরা মনে করতে থাকেন যে তাঁদের প্রস্তুতি দরকারএ জন্য তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তাঁদের প্রতি কোনো নির্দেশ বা কোনো সিদ্ধান্ত আসে কি নাআমি খুবই গভীরভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর তপরতা লক্ষ করতাম এবং এই খবরগুলো উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা এবং অন্যদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মহলে পৌঁছে দিতামকিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্য ও হতাশার বিষয় হলো, এ বিষয়ে আমাদের আওয়ামী লীগের তরফ থেকে কেউ কিছু জানায়নিপাকিস্তান সামরিক বাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পথেকিন্তু আমাদের করণীয় কী-এ প্রসঙ্গে আমাদের কিছুই জানানো হয়নিকোনো নির্দেশ আমরা পাইনিএ থেকে আমাদের অর্থা কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মনে হয়েছিল আসলে আওয়ামী লীগের দিক থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধপ্রস্তুতি নেইএমনকি এ সংক্রান্ত কোনো চিন্তাভাবনাও তাদের ছিল বলে মনে হয়নি

ফলে ২৫ মার্চে ঢাকাসহ সারা দেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন এটা প্রতিরোধের জন্য বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের কোনো প্রস্তুতি ছিল নাএটা একটা বাস্তব সত্যতবু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সেনাসদস্যরা যে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন-এটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনাবিনা প্রস্তুতিতে সীমিত অস্ত্রপাতি নিয়ে তাঁরা যে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন, এটা একটা উল্লেখযোগ্য দিকফলে আমাদের ভীষণ ক্ষতি হয়েছিলএই ক্ষতি হতো না, যদি বাঙালি সেনাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চমহল থেকে পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে অবহিত করা হতোএর পরে সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহী কর্মকর্তারা প্রথম যেখানে একত্র হন, সেটা হলো তেলিয়াপাড়া চা-বাগানএটা হলো ৪ এপ্রিলএখানে ওসমানী সাহেবও উপস্থিত ছিলেনতবে তিনিও গিয়েছিলেন হঠা অবস্থার মুখে পড়ে, কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াইওই সভায় বাংলাদেশের সীমান্তকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়এই দায়িত্বের পেছনে কোনো প্রকার আর্থিক, সাংগঠনিক বা সামরিক সমর্থন বা সামর্থ্য ছিল না

এ পর্যায়ে অর্থা এপ্রিলের প্রথম দিকে যুদ্ধ আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে সীমান্তের দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকেএই প্রতিরোধ যুদ্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা যেমন নিহত বা আহত হয়েছিলেন, তেমনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছিলএর পরেই বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়, বিভিন্ন সেক্টর গঠিত হয় ইত্যাদি

 

মঈদুল হাসান: এর সঙ্গে আমি একটা কথা যোগ করতে চাচ্ছিপাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চের আগে থেকে কিছু বাঙালি ইউনিট নিরস্ত্র করতে শুরু করে, সেনাবাহিনী ও ইপিআরের কোনো কোনো ইউনিট২৫ মার্চের পর যখন কতকগুলো সেনা ও ইপিআর ইউনিট বিদ্রোহ ঘোষণা করল, তখন পাকিস্তানি বাহিনী তাদের হত্যা করতে শুরু করলঅনেক লোক মারা গেছেপরে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো তথ্য সংগৃহীত হয়েছে কি না আমি জানি নাআরেকটি বিষয়, অনেক জায়গায় সেনাদের চাপে পড়ে অনেক অফিসার স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে এলেনবিদ্রোহ করার পর তাঁদের কিন্তু ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা রইল নাফিরে গেলেই কোর্ট মার্শাল-এটা তাঁরা খুব ভালো করে জানতেনসেই বোধ থেকেই তেলিয়াপাড়ায় যে সভা হয়েছিল, সেখানে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটা সরকার গঠন প্রয়োজনএই সরকার স্বাধীনতা ঘোষণা করবে এবং সরকারের অধীনেই যুদ্ধ পরিচালিত হবে-এ বিষয়ের ওপর তাঁরা জোর দেনএটা ছিল একটা মনুমেন্টাল সিদ্ধান্তবস্তুত, মুক্তিযুদ্ধ চালানোর পক্ষে এবং স্বাধীন সরকার গঠনের পক্ষে একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শক্তি তৈরি হয়ে গেলনয় মাসের যুদ্ধকালে আপস-মীমাংসার কথা বারবার উঠেছেহয়তো রাজনৈতিক নেতারা আপস-মীমাংসায় যেতে পারতেনকিন্তু এই বিদ্রোহী সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাদের পক্ষে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খোলা ছিল নামুক্তিযুদ্ধের এটা ছিল একটা শক্তিশালী অবলম্বন

 

এ কে খন্দকার: এখানে আমি দুটি বিষয় তুলে ধরছিএকদিকে ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় সেনা কমান্ডারদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়অন্যদিকে ৩ এপ্রিল তাজউদ্দীন সাহেব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেনতিনি এই মর্মে তাঁকে আভাস দেন যে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি সরকার গঠিত হয়েছেতাজউদ্দীন নিজেই এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীকালীন বিএসএফের প্রধান এ ব্যাপারে তাজউদ্দীনকে সহায়তা করেছিলেনসুতরাং এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটেছিলএকটি স্বাধীন সরকারের প্রধান বলে পরিচয় দেওয়ার কারণে তাজউদ্দীনের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়

 

মঈদুল হাসান: আসলে এখানে একটু তথ্যের অস্পষ্টতা আছেতাজউদ্দীন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথমবার দেখা হতেই বলেন, আমরা একটা সরকার গঠন করে ফেলেছিভারতীয় সূত্রে অন্য ভারসনও আমি শুনেছিভারতীয় পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে তোমরা একটা সরকার গঠন করলেই কেবল আমরা সাহায্য করতে পারিইন্দিরা গান্ধীর সচিব ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীনের দেখা হওয়ার আগে সরকার গঠনের ব্যাপারে এই ইঙ্গিত রেখেছিলেনএখন ইঙ্গিতই হোক, তাজউদ্দীনের উপস্থিত বুদ্ধির জোরেই হোক, আর সীমান্তে বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর পেয়েই হোক, সম্ভবত সবকিছু বিবেচনা করে দ্রুত সরকার গঠনের পক্ষে তাজউদ্দীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন

 

এ কে খন্দকার: তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ বা তাজউদ্দীনের সরকার গঠনের কথা ছাড়াও এর আগের আরেকটি বিষয় আছেএটা আলোকপাত করা প্রয়োজন২৫ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে বাঙালি সেনা ইউনিটগুলো প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েসামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহ করলে তাদের কোর্ট মার্শাল হবেইএটা জেনেই তারা বিদ্রোহ করেছেঅনেকে হয়তো অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পক্ষ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেনঅনেকে আছেন, যাঁরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগদান করেছিলেনএ সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করার জন্য ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচকভারত সরকারের বাংলাদেশকে এই সাহায্য করতে এগিয়ে আসার কারণ হলো, ২৫ মার্চের পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোর অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, এটা ভারত সরকারের অজানা ছিল নাএই যুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ অংশ নেয়এ বিষয়গুলো ভারত সরকার কর্তৃক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনদানের ইতিবাচক পটভূমি তৈরি করেছিলতাই এই প্রতিরোধ যুদ্ধের গুরুত্বকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখা যায় না

 

মঈদুল হাসান: বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর ইউনিটগুলো যুদ্ধ করে এই কারণে যে, পাকিস্তানি বাহিনীই ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর একযোগে আক্রমণ করেএ অবস্থায় ইপিআর, পুলিশ বাহিনী ওয়্যারলেসে এসওএস জানাল যে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আক্রান্তফলে বাংলাদেশের সর্বত্র অবস্থানরত সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট একযোগে বিদ্রোহ করে; যদিও পরবর্তীকালে এটা বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বানে তারা বিদ্রোহ করে যুদ্ধে নেমেছে, এটা অসত্যআসল ঘটনা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের আক্রমণ করেছে, আক্রান্ত হওয়ার পর এবং তারা বিদ্রোহ করেছে

 

এ কে খন্দকার: মঈদুল হাসান সাহেব যা বললেন, এর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমততবে একটু যোগ করতে চাই২৫ মার্চ রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে যে ঘটনা ঘটল, তার খবর সারা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষত পাবনা, যশোর, কুমিল্লা, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের আক্রমণ করেপাবনায় পুলিশ, ইপিআর পাকিস্তানিদের আক্রমণ করে পরাজিত করেকুষ্টিয়ায় যুদ্ধ হয়এই যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধএতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক ক্ষতি হয়তাদের অনেকে নিহত, অনেকে আহত এবং অনেককে আটক করা হয়এখানে কয়েকটি দিক আমাদের দেখতে হবেপ্রথমত, এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কোনো প্রকার রাজনৈতিক নির্দেশ ছাড়াইএখানে একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ শুরু হতো, তাহলে এই যুদ্ধে আমরা অনেক বেশি ভালো করতে পারতামএর চেয়ে বড় সত্য উপলব্ধি আর হতে পারে নাদ্বিতীয়ত, পাকিস্তানিদের আক্রমণের প্রথম দিকটি ছিল রক্ষণাত্মক যুদ্ধএই খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হনএভাবেই যুদ্ধের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল

 

মঈদুল হাসান: এর ফলে আবার আরেকটা ঘটনা ঘটেছিলএটা আমরা এপ্রিলের পরবর্তী দিনগুলোতে লক্ষ করেছিসামরিক বাহিনীর লোকদের মুখে শুনেছিতাঁরা মনে করতেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তো আমাদের যুদ্ধে ডাক দেয়নিকী করতে হবে বলেনিআমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম বলেই লড়াই শুরু করেছিঅস্ত্র তুলে নিয়েছিতাই লড়াই আমাদের করতেই হবেএখান থেকে আমরা কতকগুলো উপাদান পাইগোটা মার্চ মাসে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারেনিরাজনৈতিক নেতৃত্ব সুস্পষ্ট কোনো অবস্থানে আসতে পারেনিতারা কখনো বলত স্বায়ত্তশাসনের কথা, কখনো ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার কথা, কখনো বা কনফেডারেশনের কথা ইত্যাদিতাই পাকিস্তানিদের আক্রমণের পরিকল্পনা পুরোপুরিভাবে সফল হয় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তহীনতার কারণেনেতৃত্ব পুরো পরিস্থিতি অর্থা পাকিস্তানিদের তপরতা বুঝে উঠতে পারেনিএটা তাদের ব্যর্থতা, সফলতার দিক নয়শেষ পর্যন্ত সেই কারণে এই যে সিদ্ধান্তটা তারা দিতে পারেনি, তারা ঠিক করতে পারেনি - যদি পাকিস্তানিদের আক্রমণ নেমে আসে, তাহলে কে নেতৃত্ব দেবে, কোনো কমিটি নেতৃত্ব দেবে কি না, স্বাধীনতা ঘোষণা করবে কি করবে না, তারা কি দেশের ভেতরে থাকবে, নাকি অন্য কোনো অঞ্চলে গিয়ে কাজ করবে - এসব বি埗য়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনিএ অবস্থায় সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করেফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বোধটা স্বাধীনতার পরে সত্তরের দশকে কাজ করেছেআশির দশকেও কাজ করেছেবিশেষত এ জন্যই তারা রাজনীতিতে এসেছেতাই সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বুঝতে হবেসেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তারা, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা মনে করতেন যে তাঁরা রাজনৈতিক নেতাদের চেয়েও অত্যন্ত জোরালো এবং শক্তিশালীমুক্তিযুদ্ধে তাঁদের গৌরবময় ভূমিকার জন্যই তাঁরা এটা মনে করতেনবাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে সত্তর ও আশির দশকে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মনস্তাত্ত্বিক জোর, শক্তিটা কোথা থেকে এল - এটা আমরা বুঝতে চেষ্টা করিনিএ বিষয়টা আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝে উঠতে পারেনি

 

এ কে খন্দকার: এটা ঠিক যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলএটা ঐতিহাসিকভাবে সত্যমঈদুল হাসান সাহেব বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালানর একটা মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়এটা আংশিক সত্যতবে এটা গোটা সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়এটাও সত্য যে সামরিক বাহিনীর বিশাল অংশ এই সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নিসামরিক অভ্যুত্থানের ফলে প্রতিষ্ঠিত সামরিক সরকারের অধীনে তারা কাজ করেছেএকটা সুশৃঙ্খল বাহিনী বলেই তারা এটা করেছেগোটা সামরিক বাহিনী এই অভ্যুত্থানগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে দেশে একটা গৃহযুদ্ধ বেধে যেতযখন সামরিক বাহিনী দেখেছে যে সাংবিধানিক বা অসাংবিধানিকভাবে যে-ই ক্ষমতায় এসেছে, শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা তা মেনে নিয়েছেহয়তো তাদের স্বার্থ বা ক্ষোভ জড়িত ছিল, কিন্তু এগুলোর তারা বিরোধিতা করেনিরাজনৈতিক নেতৃত্বের যে কথা বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে বলতে গেলে আমার যেটুকু জানা কেবল সেটুকুই বলতে পারি১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাক আর্মির সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও বিন্দুমাত্র পদক্ষেপ নিল না যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সেই নেতৃত্ব যুদ্ধ পরিচালনা করবে কীভাবে? যুদ্ধ সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না, ইনক্লুডিং তাজউদ্দীন আহমদতাঁদের কারও ধারণা ছিল না এ সম্পর্কেপ্রথম থেকে প্রায় শেষের কাছাকাছি পর্যন্ত আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একজনের ওপর নির্ভর করে ছিল, তিনি হচ্ছেন কর্নেল ওসমানীসত্যি কথা বলতে কি, কর্নেল ওসমানী হেডকোয়ার্টার থেকে যুদ্ধের জন্য বস্তুত কিছুই করেননি

মার্চের গোড়া থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা ধারণা ছিল যে কর্নেল ওসমানী আছেন, তিনিই বিষয়টি দেখবেনহি ইজ দ্য টাইগার ফিগারকিন্তু সেখানেও আমরা অত্যন্ত হতাশ হয়েছিযাঁরা অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন - উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা সাহেব এখানে আছেন, তিনি তো নিজেই বলেছেন যে ২২ মার্চ তাঁরা যখন কর্নেল ওসমানীর কাছে গেলেন, তখন তিনি বললেন, ‘ওল্ড বয়, দিস ননভায়োলেন্ট অ্যান্ড নন-কো-অপারেশন মুভমেন্ট উইল স্টপ দ্য ট্যাংকস অন ইটস প্যাক্টস অ্যান্ড দেয়ার মে বি ফরেন ইন্টারভেনশনকর্নেল ওসমানীর মতো মানুষও যখন এমন কথা বলতে পারলেন পাকিস্তানিদের সব ধরনের প্রস্তুতি দেখেও, তখন আর কিছুই বলার থাকে নাআপনার প্রশ্নের উত্তরে শুধু এইটুকু বলব, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে কী করা হবে, আর কী করা হবে না

 

মঈদুল হাসান: এটা ঠিক যে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এ রকম একটা যুদ্ধ-সে সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল নাতারা কেউ কর্নেল ওসমানীকে ডিসটার্ব করেনিওসমানী যে নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, সেটাও তারা জানতেনকিন্তু ওসমানী অনেক নোনকোয়ানটিটি - পরিচিত অংশযেসব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তাঁদের কাউকেই তারা চিনতেন নাসেই অর্থে তাঁরা যে খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন তাদের কাছে, তা নয়এমএনএ কর্নেল রব, যিনি চিফ অব স্টাফ ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হেডকোয়ার্টার্সের কোনো সম্পর্ক ছিল নাযাদের সঙ্গে তিনি আগরতলায় থাকতেন, তাদেরও কোনো সম্পর্ক ছিল নাতাঁরা জানতেন, অর্থা রাজনৈতিক নেতৃত্ব জানতেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে যতই আমরা মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করি, আর যা-ই করি, আলটিমেটলি ইন্ডিয়ান ফোর্স দরকারইন্ডিয়া কেন যুদ্ধ করছে না, ইন্ডিয়া কেন আমাদের স্বীকৃতি দিচ্ছে না - প্রথম দিন থেকেই এসব বলে আসছিলেন আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকাজেই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কিছু জানতেন না, এ কথা আমি বলব নাআমি জানি, তারা খুব জানতেন, এই যে কমান্ড স্ট্রাকচার, আর্মি ফোর্সেস-এসব দিয়ে বিশেষ কিছু হবে নাএটা তারা এপ্রিলের শেষ নাগাদই বুঝে গেছে, যখন আমাদের ফোর্সেস সব ফেলে ভারতে গিয়ে উঠেছেতারা জানতেন, একমাত্র ভারতকেই যুদ্ধ করতে হবেভারত যখন করতে পারত না, তখন তারা সেটা বুঝতে পারতেন যে কেন ইন্ডিয়া পারছে না

 

এ কে খন্দকার: ১৯৭১ সালে প্রধানত আমাকে দুটি দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল-এক. মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এবং দুই. অপারেশনসট্রেনিংয়ের বিষয় সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমে যে কথা বলা প্রয়োজন তা হলো, ট্রেনিং কতজনকে দেওয়া হবে, কখন থেকে দেওয়া হবে, সেটা ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তরাজনৈতিক নেতৃত্বই এ সিদ্ধান্ত দিত

বস্তুত, মে মাসেই ভারত সরকার আমাদের ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে সম্মতি জানায়প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীই আমাদের ছেলেদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেযত দূর মনে পড়ে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ট্রেনিং নেওয়ার কাজটি শুরু হয়এই পর্যায়ে দুই হাজার করে রিক্রুটস করার সিদ্ধান্ত হয়এই রিক্রুট হতো আমাদের বিভিন্ন ইয়ুথ ক্যাম্প থেকেএমপি, এমএনএরা কাজটি করতট্রেনিংয়ের জন্য সিলেবাস যেটা করা হয়েছিল, সেটা ছিল বেশ সংক্ষিপ্তসময়ের কথা ভেবেই এই সংক্ষিপ্তকরণসময়কাল ছিল মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহঅথচ একজন গেরিলাকে যথাযথ ট্রেনিং দিতে হলে এর চেয়ে বেশি, অন্তত তিন মাস সময়ের প্রয়োজন ছিলকিন্তু তা সম্ভব হয়নিএ কারণে ট্রেনিংয়ের দিক থেকে কিছুটা ঘাটতি থেকেই যায়তবে এসব যুবকের অধিকাংশই যেহেতু আন্তরিকভাবে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল, সেহেতু ট্রেনিংয়ের বিষয়টি তখন খুব বড় হয়ে দেখা দেয়নিসিদ্ধান্ত হয়েছিল যে ট্রেনিং শেষে এসব ছেলেকে সরাসরি বাংলাদেশের সেক্টরগুলোতে পাঠানো হবেআমাদের সেক্টর কমান্ডাররা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব গেরিলার দায়িত্ব নেয়গেরিলাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ, টার্গেট নির্দিষ্টকরণ, অস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ও স্থির করবেন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সেক্টর কমান্ডাররাপ্রশ্ন উঠতে পারে, এ কাজ বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার থেকে কেন করা হলো না? আসলে গেরিলাযুদ্ধের জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন হয়কারণ কোনো এক গভীর জঙ্গলে অথবা প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে টার্গেট ঠিক করা বা প্রকৃত অবস্থা জানা হেডকোয়ার্টার থেকে বা কেন্দ্রীয়ভাবে করা সম্ভব ছিল নাতাই গেরিলাযুদ্ধের অধিকতর ও সন্তোষজনক ফল লাভের জন্য আঞ্চলিক কমান্ডারদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়কিন্তু প্রথম থেকেই এ বিষয়টি হয়ে ওঠেনি, আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা সেভাবে দায়িত্ব পাননি বা দেওয়া হয়নিএ কাজটি পুরোপুরিই করত ভারতীয় সেনাবাহিনীপ্রথম দিকে আমাদের গেরিলাদের কাছ থেকে তেমনভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব হয়নিএই না পাওয়ার প্রাথমিক কারণ-সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং প্রশিক্ষণ, দ্বিতীয়ত ভারতীয় পক্ষ থেকে অস্ত্রশস্ত্র না পাওয়াবিশেষত আমাদের সেক্টর কমান্ডারদের কাছে প্রথমদিকে কোনো অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হয়নিভারতীয়রা সরাসরি আমাদের গেরিলাদের ১০ জনের একেকটি গ্রুপে ভাগ করে প্রতি গ্রুপে একটি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেড দিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে, পরিকল্পনাহীনভাবে দেশের অভ্যন্তরে পঠিয়ে দিতেনএভাবে গেরিলাদের পাঠানোর ফল বেশ খারাপ হয়েছিলকারণ গেরিলাদের সঙ্গে যে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল তা দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা প্রায় অসম্ভব ছিলআমরা জেনেছি, দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো এসব গেরিলার অনেকেই ভয়ে তার গ্রেনেডটি যেখানে-সেখানে মেরেছে বা ফেলে দিয়েছেআবার ১০ জনের কোনো একটি গ্রুপ শত্রুর টার্গেটে সামান্য একটি গ্রেনেড নিয়ে আঘাত হানতে গিয়ে ১০ জনের আটজনই শত্রুর গুলিতে প্রাণ দিয়েছে১০ জনের আটজনকেই প্রাণ দেওয়ার সংবাদে আমরা তখন ভীষণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম

বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছেএকদিকে গেরিলাদের এই সামান্য অস্ত্রের কারণে পাকিস্তানিদের হাতে গেরিলাদের জীবন দান, অন্যদিকে যেখানে-সেখানে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী ওই সব এলাকা বা গ্রামে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নির্মম অত্যাচার আর হত্যাকাণ্ডের ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো গেরিলা গ্রুপ সামান্য গ্রেনেড হাতে গ্রামে প্রবেশ করলেই তাদের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে গ্রামবাসীর কাছ থেকেওদিকে গ্রামবাসী উসাহিত হওয়ার পরিবর্তে নিরুসাহিত হয়ে পড়ে গেরিলাদের কার্যকলাপে

জুন-জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে গেরিলা তপরতা পর্যালোচনা করে আমরা বুঝতে পারলাম যে গেরিলাদের কাছ থেকে আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল, সেই প্রত্যাশা তারা পূরণ করতে পারছে নাফলে, এই সময়কালে দেশের অভ্যন্তরে এবং সেক্টরগুলোতে হতাশার ভাব লক্ষ করা গেলআমাদের নিজস্ব উস এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য আমাদের হাতে এসে পৌঁছাতে লাগল

আমরা উপলব্ধি করলাম যে এই অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না বা চলা উচিত নয়তাক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গেরিলাদের ট্রেনিং এবং দেশের অভ্যন্তরে তাদের অপারেশন, অস্ত্রের স্বল্পতা, ব্যাপক হারে গেরিলার মৃত্যু ইত্যাদি বিষয় বেশ জোরের সঙ্গেই উত্থাপন করা হয়আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের ভারতীয় সেনা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রাখা, তাদের নিজস্ব পরিকল্পনামাফিক গেরিলাদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানো ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের সেক্টর কমান্ডাররা যে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, সে কথাও তাদের সামনে তুলে ধরা হয়এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন জোনের প্রধান লে. জেনালে জগজি সিং অরোরার কাছেও একাধিকবার বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়তিনি বেশ কয়েকবার আমাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হনসেখানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, কর্নেল ওসমানী, আমিসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলামসেসব সভায়ও আনুষ্ঠানিকভাবে গেরিলাযুদ্ধ ও যুদ্ধবিষয়ক সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়আমি নিজে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে একাধিকবার গেরিলা তপরতা সমস্যাগুলোর আশু সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছি

 

এস আর মীর্জা: জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি হাকিমপুরে গিয়েছিলামওখানে পশ্চিম দিনাজপুরের সাব-সেক্টর ছিলওখানে গিয়ে আমি ক্যাপ্টেন গিয়াসের দেখা পাইমেজর শাফায়েত জামিলও ওই এলাকায় ছিলেনতিনি সেই মুহূর্তে চলে গিয়েছিলেন জেড ফোর্সে কাজ করার জন্যহাকিমপুরে গিয়ে শুনলাম এক কাহিনীএক ইন্ডিয়ান সিনিয়র আর্মি অফিসার আমাদের ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে, যাদের ভালো ট্রেনিংও ছিল না তাদের কেবল হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে বগুড়ায় পাঠিয়েছেন অপারেশনের জন্যক্যাপ্টেন গিয়াস আমাকে বললেন, ওই ৩০ জনের মধ্যে ২৮ জনই ধরা পড়েছে এবং তাদের পাকিস্তানিরা হত্যা করেশুধু দুজন পালিয়ে আসতে পেরেছেএরপর আমি লালপুর, বহরমপুর হয়ে কলকাতায় ফিরিবহরমপুর থেকে মেজর সফিউল্লাহ আমার সঙ্গী হয়েছিলেন কলকাতায় আসার জন্য

কলকাতায় এসেই আমি এ কে খন্দকার এবং প্রফেসর ইউসুফ আলীকে ঘটনাটি বলিপ্রফেসর ইউসুফ আলী ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলেনসেই সময় আমি ইয়ুথ ক্যাম্পের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দিইআমরা দীর্ঘ আলোচনা করেছিলাম আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, তাদের ট্রেনিং, অস্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়েআমি বলেছিলাম, ১. নো গেরিলা ফাইটার শ্যুড বি সেন্ট ইনসাইড উইদাউট ট্রেনিং, ২. অল গেরিলা অপারেশন মাস্ট বি ডান আন্ডার দ্য লিডারশিপ অব আওয়ার ওন পিপল অ্যান্ড নট ইন্ডিয়ান আর্মিআমার এই পরামর্শ এ কে খন্দকার গ্রহণ করেছিলেনতিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলেছিলেনপরবর্তী সময়ে সেটি কার্যকরও হয়েছিল বলে আমি জানি

 

মঈদুল হাসান: ইয়ুথ ক্যাম্প শুরু হয়েছিল আগরতলায়আপনি এটা কী অবস্থায় পেয়েছিলেন?

 

এস আর মীর্জা: প্রথম দিকে কীভাবে হলো এটা আমি জানি নাআমি যখন যোগ দিই তখন মাহবুবুল আলম চাষী, নূরুল কাদের খান এঁরা ছিলেনজুনের মাঝামাঝি থেকে আমি এই দায়িত্বে যোগ দিই

 

মঈদুল হাসান: কোনো ট্রান্সপোর্ট ছাড়াই আপনি এক হাজার ৪০০ মাইল সীমান্তজুড়ে স্থাপিত যুবশিবিরগুলো দেখাশোনা করতেনতারপর ইয়ুথ ক্যাম্পে সবাইকে রাখা যাবে না বলে যুব অভ্যর্থনা শিবির করা হলোযুবশিবিরের সংখ্যা ছিল ৩০০, অভ্যর্থনা শিবিরের সংখ্যা ছিল ৪০০এর কোনোটিতেই যাওয়ার মতো একটা ট্রান্সপোর্ট আপনাকে দেওয়া হয়নিতাই আপনি কাজ করতেন এমপিএ এবং এমএনএদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেতারাই এর দায়িত্বে ছিলেনতারা যখন কলকাতায় আসতেন তখন আপনি তাদের কাছে খবর পেতেনএই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মতো ন্যূনতম সাপোর্ট আপনাকে দেওয়া হয়নিএ থেকে বোঝা যায় আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার দিকটিমুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুট করার আগে মেইন সেন্টার ইয়ুথ ক্যাম্পের ওপরও তারা কতটা গুরুত্ব দিতে পেরেছিলকতটা অসংগঠিত ছিল এই যুবশিবিরগুলো

 

এ কে খন্দকার: ক্যাম্পে এমপিএ, এমএনএদের মূলত কোনো কাজ ছিল নাযুবকদের সঙ্গে মেলামেশা করাই ছিল তাঁদের মূল কাজপ্রত্যেক এমএনএ, এমপিএরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করতেনট্রেনিংয়ের প্রয়োজন হলে ছেলেদের মধ্য থেকে তাঁরাই বাছাই করে দিতেনআর হেডকোয়ার্টার্সে এসে তাঁদের জন্য টাকা-পয়সা নিতেনএর বাইরে তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল নাএসব এমপি সবাই যে যুব ক্যাম্পে থাকতেন তা নয়কিছু কিছু এমপি থাকতেনযাঁরা থাকতেন তাঁদের প্রধান কাজ ছিল নিজ নিজ এলাকার ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের আশ্বাস দেওয়া যে মুক্তিযুদ্ধ ভালোভাবে চলছে, এটা সফল হবেউদ্বুদ্ধকরণ বিষয়টির ওপর সবচেয়ে জোর দেওয়া হয়েছিলকিন্তু এটা ছিল নাম মাত্রএ বিষয়ে দু-একটি বক্তব্য দেওয়া হলেও তা ছিল খুবই দুর্বলএটা তেমন কার্যকর ছিল না

 

এস আর মীর্জা: মুক্তিযুদ্ধের নীতি ও কৌশল নামের একটি পুস্তিকা বিতরণ করা হয়েছিলতাতে একটা গাইডলাইন ছিল

এ কে খন্দকার: ইয়ুথ ক্যাম্পে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মূল কাজ ছিল ছেলেপেলেদের মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো দেখা, তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো ছেলেগুলো বাছাই করা, তাদের নিয়ে দৈনিক একটা প্রোগ্রাম করা-এসব কাগজে লেখা ছিলকিন্তু আমি যেসব ক্যাম্পে গিয়েছি, সেগুলোর দু-একটাতে এসব করা হতো, কিন্তু বেশির ভাগ ক্যাম্পে করা হতো না

ক্যাম্পগুলো পরিচালনা বা তাদের কীভাবে পরিচালনা করা হবে এই সম্পর্কে একটা নির্দেশনা ছিলকিন্তু আমি বলছি বাস্তবতার কথাবাস্তবে কিছু কিছু ক্যাম্পে কয়েকজন এমপি এই বিষয়ে উদ্যোগী ছিলেনকিন্তু বেশির ভাগ ক্যাম্পে এগুলোর কিছুই হতো নামাসের পর মাস এসব ছেলেকে উজ্জীবিত রাখা ছিল একটা পূর্ণকালীন কাজএটা বড় একটা কাজমুক্তিযুদ্ধে তরুণদের একটা অংশ এসেছিল আত্মরক্ষার তাগিদেকিন্তু বড় অংশটিই এসেছিল যুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্যএটা আমার অভিজ্ঞতাআমি ছোট একটি উদাহরণ দিচ্ছিএকদিন রাত ১২টা কি সাড়ে ১২টার দিকে একটি ক্যাম্পে পৌঁছালামসময়টা ঠিক মনে নেইএই সময় অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছেএকটা খোলা মাঠএক স্থানে একটা তাঁবু টানানোসারù