নাম : ডা: আসহাবুল হক জোয়ারদার
পিতা : মৃত আহমদ আলী জোয়ারদার
মাতা : মৃত হাজেরা খাতুন
গ্রাম /মহল্লা : স্টেশন রোড, ইউনিয়ন/ পৌরসভা : চুয়াডাঙ্গা
থানা : চুয়াডাঙ্গা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা (১৯৭১ সালে কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত মহকুমা)
শিক্ষাগত যোগ্যতা : মেডিকেল ডিগ্রি (ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুল, কলকাতা)
১৯৭১ সালে বয়স : ৪৯ (জন্ম : ৪ ডিসেম্বর ১৯২১)
১৯৭১ সালে পেশা : রাজনীতি ও চিকিৎসক
বর্তমান পেশা : অবসর জীবন
প্র: আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে বলবেন কি ?
উ: আমার শিক্ষা জীবন শুরু হয় চুয়াডাঙ্গার একটি পাঠশালাতে। তারপর চুয়াডাঙ্গা ভিক্টোরিয়া জুবিলী হাই স্কুলে পড়াশোনা করার সময় ক্লাস নাইনে প্রমোশন পাওয়ার পর আমার বাবা আমাকে কলকাতাতে নিয়ে যান। সেখানে খিদিরপুর একাডেমীতে আমি নিয়মিত ছাত্র হিসাবে পড়াশুনা করে ম্যাট্রিক পাশ করি এবং পরবর্তীতে কলকাতায় ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হই। আমার শিক্ষা জীবন মোটামুটিভাবে সেখানেই শেষ হয়।
প্র: আপনি রাজনীতিতে কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন এবং আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্বন্ধে কিছু বলুন ?
উ: এ প্রসঙ্গে একটা মজার কথা বলতে হয়। পাকিস্তান হওয়ার অনেক আগে আমাদের এখানে একটা বাই-ইলেকশন হয়। তখনকার দিনের প্রভিনশিয়াল অ্যাসেমব্লিতে আমাদের এখানে মেম্বার ছিলেন আফতাব হোসেন জোয়ারদার। তিনি মারা যাওয়ার পর ঐ ভ্যাকেন্ট সিটে আমার চাচা বাই-ইলেকশনে একজন প্রার্থী হিসেবে কনটেস্ট করেন। আমার চাচা ছিলেন এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের আশীর্বাদপুষ্ট। আর ডা: এম. এ. মালিক অর্থাৎ আবদুল মোতালেব মালিক মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন। পরবর্তীতে পত্রিকার বদৌলতে মালিক শব্দটা মালেক হয়ে গেছে। আসলে মালিক হচ্ছে তাদের পরিবারের পদবী। এই এম. এ. মালিকই ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। যাহোক, সেই উপ-নির্বাচনে কনটেস্ট করে আমার চাচা হেরে যান। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর ডা: এম. এ. মালিকের পক্ষে একটা আনন্দ মিছিল বেরোয়। সেই মিছিলের ছেলেরা আমার চাচার নাম লেখা পোস্টারগুলো আমাদের বাড়ির সামনে পদদলিত করে। এটা তখন আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক মনে হয়। সেদিন কেন জানি না, আমি মনে মনে এর একটা জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। এই ঘটনাটাই বোধহয় রাজনীতির দিকে আমার মনটা ঘুরিয়ে দেয়।
এর কিছুদিন পর, বোধহয় গরমের ছুটির সময় আমি বাড়িতে আছি। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। হঠাৎ খবর পেলাম যে, মরহুম হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব সংক্ষিপ্ত সফরে চুয়াডাঙ্গায় আসছেন। কী শুনলাম আর কী বুঝলাম জানিনা, বাড়ি থেকে বেরিয়ে হঠাৎ এক দরজিকে বললাম মুসলিম লীগের একটা ফ্ল্যাগ তৈরি করে দাও তো। দরজি আমাকে একটা ফ্ল্যাগ তৈরি করে দিলো। আমরা দুই বন্ধু একটা বাঁশের মাথায় ফ্ল্যাগটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে রেল স্টেশনে গিয়ে হাজির হলাম। আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে ট্রেনটা ইন করলো। মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ স্টেশনের একদিকে বসে আছেন। আর আমরা দু’জন ঐ ফ্ল্যাগটা হাতে করে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি। হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব যে কম্পার্টমেন্টে ছিলেন সেখান থেকে প্লাটফর্মে তাকিয়ে বোধহয় দেখলেন ফ্ল্যাগটা। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানতেন যে, চুয়াডাঙ্গায় কেউ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না। তিনি ট্রেন থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে ফ্ল্যাগের কাছে এসে হাজির হলেন। ফলে, অবস্থাটা এমন হলো যে, মনে হচ্ছে আমরাই তাঁকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি। আমাদের বয়স তখন কম। তিনি খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কি ? আরো কিছু জিজ্ঞেস করলেন। দেখলাম, তাঁর সঙ্গে আরও দু’জন যুবক। তাদের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় হলো। তাঁদের মধ্যে পরে একজন অত্যন্ত নামকরা মানুষ হয়েছিলেন। আমাদের পুরনো দিনের বন্ধু সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী যিনি দরবার-ই জহুর নামে পরিচিত। আর একজন পুলিশের চাকরি করে রিটায়ার করেছেন। নাম আবদুল মান্নান। আমার সেদিনের এই তৎপরতায় চুয়াডাঙ্গায় মুসলিম লীগের আসল যারা তারা কিন্তু অনেকটা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে গেলো। যাহোক, বৃষ্টির মধ্যে তারা আবার গাড়িতে উঠলেন। হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব যাওয়ার সময় আমাদের বারবার বললেন, তোমরা মিটিংয়ে চলে এসো। তিনি বার বার বলেছেন তাই মিটিং-এ গেলাম। আমার কিন্তু তেমন ইন্টারেস্ট ছিলো না। কিন্তু লাভ হলো। জহুর আমার সমস্ত খবর নিলো। আমি কি করি তাও জানলো। আমি ক্যাম্বেলে পড়ি শুনে বললো, তুমি কলকাতায় গিয়ে অবশ্যই আমার সাথে দেখা করবে। এভাবেই জহুরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় এবং তাঁর হাত ধরেই আমার রাজনীতিতে প্রবেশ। জহুর, মান্নান এদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ, ভূতনাথ, সত্য, গৌর এমনি অনেকের সাথে পরিচিত হলাম। কিছুদিন পরে কমরেড এম. এন. রায় আসলেন কলকাতা থেকে। তাঁর সাথেও পরিচিত হলাম। হরিদা, রজনীদা অনিলদা, সুনীতিদার কথা কারো মনে আছে কিনা জানি না। সুনীতিদা, প্রফেসর ব্যানার্জী এমনি কত বিশিষ্ট ব্যক্তি, জ্ঞানী গুণী একঝাঁক মানুষের সঙ্গে আমার পরবর্তীতে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। আজ আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে স্মরণ করি। তাঁরা আমাকে তাঁদের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে বিকশিত হতে সাহায্য করেছিলেন। আমি আজ অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে তাঁদের স্মরণ করি।
প্র: সে সময়ের পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি আপনার মনোভাব কি ছিলো-সে সম্পর্কে একটু বিশদভাবে বলুন ?
উ: বিভাগপূর্ব ভারতে আমার রাজনীতিতে হাতে খড়ি কমরেড রায়ের হাতে অর্থাৎ এম. এন. রায়। আমার রাজনীতির বুদ্ধি বিকাশ যা কিছু তাঁরই চিন্তাধারার ফল আমি বলবো। তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছিলেন অন্ধভাবে কোনো মতবাদ গ্রহণ না করতে। যুক্তির উপর ভিত্তি করে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের উপর ভিত্তি করে যেটা গ্রহণযোগ্য হবে সেটা গ্রহণ করতে হবে। এমনকি সেটা তেতো হলেও তা গ্রহণ করার মনোভাব বজায় রাখতে হবে। আমি সেই পথ ধরেই এগিয়েছি। তাঁর লেখা বহু বই আমরা পড়েছি এবং আলোচনা করেছি, জানতে চেয়েছি, শিখতে চেয়েছি। যখন বুঝতে পারিনি তখন জিজ্ঞাসা করেছি অনেকের কাছে এবং যতক্ষণ আমি না বুঝতে পেরেছি ততক্ষণ তাঁরা শিক্ষকের মতো বসে বসে আমাকে বুঝিয়েছেন। সেইদিনগুলোর কথা আমার সব সময় মনে হয়। কমরেড রায়ের শিষ্য হিসাবে রাজনীতির আকাশে অন্ধ বিশ্বাসের কোনো স্থান আমার মধ্যে ছিলো না। ফলে, আমাদের একটা প্রশ্ন ছিলো যে, পাকিস্তান যেটা হবে সেটা শ্রমিকের পাকিস্তান, দরিদ্রের পাকিস্তান, গরীবের পাকিস্তান হবে, না ইস্পাহানি, আদমজী, দাউদের পাকিস্তান হবে। এই প্রশ্নটা বরাবর আমাকে ভুতের মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। সেই সময় এক বন্ধু থেকে আরেক বন্ধুর কাছে অর্থাৎ যাঁরা পাকিস্তান মুভমেন্টে ছিলো তাঁদের অনেককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি। অদ্ভুত অদ্ভুত সব উত্তর পেয়েছি। তার মধ্যে এক বন্ধু একদিন উত্তর দিলো যে, ওটা বিশেষ একটা বিষয়। সে সম্বন্ধে আমরা জিন্নার উপরে দায় দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি যেটা করবেন সেটাই আমরা মানবো। আমার জিজ্ঞাসার উত্তর আমি পাইনি। ফলে, কোনোদিন আমি পাকিস্তান আন্দোলনে ছিলাম না। দেশ ভাগের পর পাকিস্তানকে আমি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।
প্র: এই সময় অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিলো সে সম্পর্কে আপনি কি জানেন ?
উ: তখন আমি ক্যাম্বেলে পড়া ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু আসা যাওয়া করি। ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট দাঙ্গাটা শুরু হয়েছিলো। আমার এখনও মনে আছে তার আগের দিন ১৫ তারিখে আমি ক্যাম্বেলে গিয়েছিলাম। সেখানকার তৎকালীন ছাত্র নেতারা সেদিন একটা মিটিং ডেকেছিলেন। তারা কি কর্মপন্থা এবং কি কর্মসূচি গ্রহণ করবেন সে ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তারা আমাকে ডেকে নিয়েছিলেন। সেদিন সেখানে তাদের আলোচনা শুনে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। শুনলাম যে আগামীকাল অর্থাৎ ১৬ তারিখে একটা বিরাট রক্তক্ষয়ী ব্যাপার হতে চলেছে। আমি কলকাতায় থাকি। আমার চাচা ডাক্তার। আমরা এক বাসায় থাকি। খিদিরপুর মুসলমান মহল্লায় বসবাস করি। সেখানে মারামারি, মানুষ খুনোখুনির কোনো কথা আমরা শুনলাম না অথচ ক্যাম্বেলে এসে শুনছি। আমার বন্ধুরা ঘটনা ঘটলে কিভাবে রিলিফ দেবেন, কিভাবে কি করবেন--এই নিয়ে তারা অত্যন্ত চিন্তিত। তারা একটা কর্মসূচি নিলেন। ওরা আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করলো আমি যেন কালকে অবশ্যই আসি। তারা বললো, এ ব্যাপারে আপনাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে। আমি তাদের কথা দিলাম।
সেদিন অর্থাৎ ১৬ অগাস্ট আমি বাড়িতেই ছিলাম। সকালের দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে একটু ঘুরে এলাম। তেমন কিছু চোখে পড়লো না। আমাদের বাসার কর্মচারিরা ছুটির দিন বলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলো। বিকেলের দিকে আমি বাড়িতে আছি, এমন সময় কর্মচারিরা ফিরলো। দেখি, তারা হাঁপাচ্ছে, দু’জনের গা ঘামছিলো এবং ভীষণ ভীত সন্ত্রস্ত। আমি তাদের বলি কি ব্যাপার ? তারা বলে যে, কি হচ্ছে আপনি বুঝতে পারবেন না, কি হচ্ছে বিশ্বাসও করবেন না। তারা যেটা বললো, সেটা আমার কাছে খুবই আশ্চর্য লাগলো। একটা মানুষ রাস্তার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর একটা মানুষ এসে তার চুলটা ধরে মাথা উঁচু করে এক কোপ মারলো এবং মাথাটা কেটে হাতে করে নিয়ে দৌড় মারলো। ঘটনাটা ঘটেছিলো ভবানীপুরে, হাজারী রোডের মোড়ে, হাজরা পার্কের ক্রসিংয়ের ওখানে। ওরা তখন সিনেমা হলে। ঘটনা যখন ঘটছে তখন তাড়াতাড়ি সিনেমা শেষ করে দিয়ে কর্তৃপক্ষ বলে যে, কেউ বাইরে বেরুবেন না, বাইরে বেরুবেন না। এরপর দর্শকরা যে যার বাড়ি চলে যায়। বাইরে বের হয়ে ঐ অবস্থা দেখে তাদের আর দাঁড়াবার উপায় ছিলো না। তারা তখনই দৌড় দিয়েছে। রাস্তায় যানবাহন নাই। দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি আসে তারা। আমাদের এই দু’জন কর্মচারির একজন হিন্দু, অন্যজন মুসলমান। তখন ধুতি পরতো সকলে। দু’জনের পরনেই ধুতি ছিলো। এরা দু’জন কোনো রকমে রাস্তা দিয়ে কালীঘাট পার হয়ে তারপর বাড়ি আসে। এই সংবাদ পাওয়ার পর আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এরপর তখন থেকে সারা রাত শুধু চারদিকে বিভিন্ন ধরনের শব্দ শুনছিলাম। আওয়াজ আসছিলো ‘বাঁচাও’, ‘বাঁচাও’। কখনও কখনও জিন্দাবাদ ধ্বনিও শুনতে পাচ্ছিলাম। যেখানে আমাদের বাসা ছিলো সেখান থেকে ৪/৫শ’ গজের মধ্যে আবার একটা হিন্দু মহল্লা ছিলো। রাত ১২/১টার দিক থেকে আমার চাচার কাছে আহত লোকেরা আসতে আরম্ভ করলো। ঐদিন ছুটি ছিলো বলে চাচাও বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলো। সে রাতে আমাকেই ডাক্তার হতে হলো। আহত মানুষদেরকে সেলাই দেওয়া, ব্যান্ডেজ করা ইত্যাদি কাজ করলাম। আমাকে যে অ্যাসিস্ট করছিলো সে কিন্তু একজন হিন্দু কর্মচারি ছিলো। আমি একই সঙ্গে হিন্দু এবং মুসলমান মহল্লার মধ্যে কাজ করেছি। সারারাত আমরা ঐ কাজ করলাম। সকালে চাচার ঔষধের দোকানে গেলাম। দেখলাম, সেই বিশৃঙ্খল অবস্থায় মানুষ কেউ বাড়িতে নেই। সব রাস্তায়। কারো হাতে কিছু না কিছু একটা আছে। লাঠি যার নেই তার হাতে খড়ি কাঠ আছে। আমার চাচার ওষুধের দোকান খোলা হলো। আধা ঘন্টার ভিতরে সম্পূর্ণ দুধের স্টকটা শেষ হয়ে গেলো। বোঝা গেলো যে, শিশুদের খাবার যেটা বাইরে থেকে সাপ্লাই আসতো সেটা আর নেই। দোকানে কিছুক্ষণ বসে থেকে আর ভাল লাগলো না। দোকান বন্ধ করে দিয়ে আবার বাসায় চলে এলাম। এর মধ্যে আমি ক্যাম্বেলে টেলিফোন করলাম। ক্যাম্বেলে টেলিফোন করলে আমার নাম শুনেই তারা বলে কি ব্যাপার ! আপনি আসলেন না ? আমি তাদের বললাম আসবো কি করে ! আমি তো বেরই হতে পারছি না। ওরা বললো ঠিক আছে আপনি বাসায় থাকুন। যে কোনো সময় আপনাকে নিয়ে আসবো। বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে রেডি হয়ে থাকলাম। বিকেলের দিকে অ্যাম্বুলেন্স এসে আমাকে একটা ক্যাম্পে নিয়ে গেলো। ওখানে গিয়ে আবার আমি কাজ শুরু করলাম।
প্র: কি কাজ ?
উ: কাজ হচ্ছে রাস্তা থেকে আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। শুধু একটাই কাজ। ১৭ তারিখ সন্ধ্যা থেকে আমার এই কাজ আরম্ভ হলো। যারা সে দৃশ্য দেখেনি তারা বিশ্বাস করবে না কি বীভৎস সেই দৃশ্য।
প্র: অ্যাম্বুলেন্সে আপনারা কোন্ কোন্ সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন ?
উ: সবাই মিলে ছিলাম। ড্রাইভারটা তো হিন্দু। আমি মুসলমান। আমার সঙ্গে যারা ছিলো তারা মোস্টলি হিন্দু। জহুরের ভাই মেসবাহ আমাদের সঙ্গে ছিলো। যাহোক, কলকাতা ঠান্ডা হলো। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাটা ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। বিহারে রায়ট হলো। সেখানে আমরা ভলেন্টিয়ার হিসাবে গেলাম।
প্র: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আপনি কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন এবং এতে আপনার ভূমিকা কি ছিলো ?
উ: পাকিস্তান হওয়ার কিছুদিন আগে আমি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। পরে পরীক্ষা দিয়ে আমাকে ডাক্তার হতে হয়। ডাক্তার হওয়ার পর চিকিৎসা পেশায় জড়িয়ে পড়ি। এর মধ্যে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হলো। এর আগে আর একটা ঘটনা ঘটে। সেটা হলো ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গায় সেই সময়ের মুসলিম লীগ ক্যান্ডিডেট ডা: এম. এ. মালিকের বিরুদ্ধে আমি কনটেস্ট করেছিলাম। আমি তার বিরোধিতা করেছিলাম। যদিও নির্বাচনে আমি হেরে গিয়েছিলাম। কিন্তু গর্বের সঙ্গে বলতে চাই যে, আমার সিকিউরিটি মানি বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি। যদিও তখন ২৫ বৎসর না হলে ইলেকশন করা যেতো না। আমার তখনও ২৫ বৎসর পুরো হয়নি। তখন আমি বয়স সম্পর্কে ফলস স্টেটমেন্ট দিয়েছিলাম। ঐ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগ বিরোধী লোকের নামের তালিকায় আমার নাম এসে যায়। ১৯৪৯ সালে কিছু লোক আমাকে বললো, আপনি আসেন আমাদের সঙ্গে। আমি বললাম কেন ? ওরা বলে বিরোধী রাজনীতি করতে হবে। আমি বললাম তোমাদের কর্মসূচি কি ? তারা বলে মুসলিম লীগের বিরোধিতা করতে হবে। আমি বললাম, শুধু বিরোধিতা করে তো রাজনীতি হয় না।
প্র: আপনি তখন কোথায় ছিলেন ?
উ: চুয়াডাঙ্গাতে। আমি তাদের বললাম, বিরোধিতা করতে হলে মুসলিম লীগ গভর্নমেন্ট কি করছে না করছে আর তোমরা ক্ষমতায় গেলে কি করবে না করবে এর উপরে পরিষ্কার বক্তব্য রেখে আমার কাছে এসো। ওসব ফেক কথার ভিতরে আমি নেই। কিন্তু ওরা আমার ব্যাপারে চেষ্টা ছাড়লো না। আমার কাছে তারা আসা যাওয়া করে, গল্পগুজব হয়। কিন্তু আমি আর আগ্রহী হই না। এই হতে হতে ’৫৪ সালের নির্বাচন আসলো। সেই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। দেখলাম যে, একটা পজিটিভ কর্মসূচি তারা দিয়েছে এবং এখান থেকে তাদের পিছিয়ে যাওয়া অসুবিধা হবে। ভাবলাম, ২১টার ভিতর থেকে যদি বেশিরভাগ দফাও বাদ যায় তাহলেও অন্তত:পক্ষে ৫/৬ টা দফা তো থাকবে। তাদের কিছুটা পজিটিভ প্রোগ্রাম থাকার জন্য আমি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হলাম। যদিও তখন আমি কোনো দলে যোগ দেইনি। তখন এই ২১ দফাকে সার্পোট করে আমি ইলেকশন ক্যাম্পিংয়ে নামলাম। আমি নিজে অবশ্য ক্যান্ডিডেট হলাম না। কারণ আমার আর্থিক অবস্থা তখন ভালো না। ইলেকশনে সামান্য হলেও যে খরচ হবে সেই টাকা আমার ছিলো না। অন্য ক্যান্ডিডেট যাঁরা দাঁড়ালেন তাঁদের মধ্য থেকে যাঁরা যুক্তফ্রন্টে নমিনেশন পেলেন তাঁদের পক্ষে আমি কাজ করতে লাগলাম। চুয়াডাঙ্গার দু’টা সিটে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী বিজয়ী হলো।
প্র: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আপনার কোনো ভূমিকা ছিলো কি ?
উ: সেই অর্থে সরাসরি আমার কোনো ভূমিকা ছিলো না। তবে ভাষার দাবিতে যখন আন্দোলন শুরু হলো তখন এ ব্যাপারে ভেবেছি। তখন মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে থাকলাম, ইস্ট পাকিস্তানের মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। সিন্ধীতে সিন্ধী ভাষায় কথা বলে, পাঞ্জাবে পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলে। কিন্তু পাকিস্তানে উর্দু কারো ভাষা না। যদি শিখতেই হয় তাহলে ইংরেজি শিখলেই তো আরও সুবিধা হয়। আসলো ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় গুলি চললো, মানুষ মারা গেলো। চিন্তা করা যাবে না যে, চুয়াডাঙ্গা হঠাৎ সম্পূর্ণ বদলে গেলো। ধর্মঘট তো ধর্মঘট। একমাত্র ওষুধের দোকান ছাড়া সব বন্ধ ছিলো। রাস্তায় মানুষজন ছিলো না। তারপর মিটিং হলো। চুয়াডাঙ্গা ভিক্টোরিয়া জুবিলী হাই স্কুল প্রাঙ্গণে মিটিং হবে। সেখানে সবার আমন্ত্রণ। আমিও যাবো। ঐ স্কুলের কাছাকাছি তখন আমার ডাক্তারখানা। সেদিন আমি ডাক্তারখানাতেই ছিলাম। আমি বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম। ৫ টার সময় মিটিং ছিলো। ৫-১৫ মিনিটের দিকে বের হলেও হবে। আমি কাজ সেরে যখন মিটিংয়ে যাচ্ছি তখন দেখি মোহাম্মদ শাহজাহান আর আবদুর রহিম আমার কাছে আসছে। তারা দু’জন আমার কাছে এসে বললো, চাচা, আপনি শিগগির চলেন। আমি বললাম, কেন ? তারা বলে যে, আপনাকে মিটিং প্রিজাইড করতে হবে। আমি বললাম, কেন ? আরও মুরুব্বীরা তো আছে ! তাদের প্রিজাইড করতে বলো। তারা বলে, সবাই মিটিংয়ে এসেছেন, কিন্তু প্রিজাইড কেউ করতে চাচ্ছেন না। তারপর আমি গেলাম। দেখি যে মাঠ ভর্তি হয়ে গেছে। আমি ওখানে গিয়ে মুরুব্বী যারা ছিলেন-তাদেরকে বললাম যে, আমি প্রিজাইড করবো না। তারা বলে না, তুমিই করো, আমরা সবাই মত দিচ্ছি, তুমি করো। শেষ পর্যন্ত সেই সভা আমাকেই প্রিজাইড করতে হলো। ভাষা আন্দোলনে আমার ভূমিকা যদি কিছু থেকে থাকে তো এইটুকুই। যাহোক, মিটিংয়ে বক্তৃতা আরম্ভ হলো। অনেকে বক্তৃতা দিলো। বাংলার পক্ষের বক্তৃতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি দাঁড়িয়ে বললাম যে, উর্দু ভাষার পক্ষে যদি কারো কোনো বক্তব্য থাকে আমি অনুরোধ করবো আপনি আসেন, বক্তব্য রাখেন। আমার গুরুতো এম. এন. রায়। তিনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন অপরের মতটারও সমান দাম দিতে। আমি সেই শিক্ষা থেকেই এ কথাটা বললাম। দেখলাম সভায় উর্দু স্পিকিং কিছু লোক আছে। কিন্তু কেউ কথা বললো না। মিটিংয়ে বাংলার পক্ষে রেজুলেশন পাশ হয়ে গেলো। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। এর জন্য আমাদের কর্মসূচি বা সংগ্রাম চলতে থাকবে ইত্যাদি রেজুলেশন হয়ে গেলো। সত্যি কথা বলতে কি ঐ আন্দোলনে এ ছাড়া আমার আর কোনো ভূমিকা ছিলো না।
প্র: ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর আপনি কি করলেন ?
উ: নির্বাচন হয়ে গেলো। এই নির্বাচনের আগে একদিন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে আমার ক্যাজুয়েলি দেখা হলো। তখন উনি যশোর থেকে ট্রেনে করে কুষ্টিয়া যাচ্ছিলেন। অনেক রাতে তিনি চুয়াডাঙ্গায় স্টপ ওভার করছেন। আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে রেলওয়ে কম্পার্টমেন্টের ভিতর থেকে নামাতে গিয়েছি। আমার সঙ্গে আরও লোক আছে। কিন্তু কেন জানি উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আর ইউ ক্যান্ডিডেট’ ? আমি বললাম, ‘নো স্যার, আই অ্যাম জাস্ট এ ওয়ার্কার’। তিনি আমাকে আর কিছু বললেন না। উনি রেলওয়ে স্টেশনে কিছু সময় থাকলেন। রেলওয়ে স্টেশনে আমরা একটা ক্যাম্প খাট পেতে ওনার বিশ্রামের ব্যবস্থা করলাম। যাওয়ার সময় উনি আমাকে বললেন, ‘হোয়াট আর ইউ ডুয়িং ? আমি বলি, ‘আই অ্যাম এ মেডিকেল প্র্যাকটিশনার’। উনি বললেন, ‘দ্যাটস নাইস। ওয়েলকাম, হোয়াই ডো’ন্ট ইউ কাম অ্যালন’ ? আমি ভাবলাম কাম অ্যালন মানে উনি ওনার সাথে আমাকে যাওয়ার কথাই বোধহয় বলছেন। উনি যাচ্ছেন কুষ্টিয়া। কিন্তু আমি কুষ্টিয়াতে গেলাম না। উনি ট্রেন ছাড়বার আগে আবার আমাকে বললেন, কাম অ্যান্ড মিট মি সাম টাইম। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে এটাই আমার প্রথম দেখা নয়। দেশ ভাগ হওয়ার আগে কলকাতাতে আমি শ্রমিক আন্দোলন বা শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমাদের র্যাডিকেলসদের নেতৃত্বে কলকাতায় যে ইউনিয়নগুলো ছিলো আমি তার একটার সেক্রেটারি, আর একটার প্রেসিডেন্ট ছিলাম। দেশ ভাগ হয়ে যাবার পরই আমরা মনে করলাম যে, রাতারাতি সব বদলে যাবে। এই ভাবটা সকলেরই হলো। তখন হরদম স্ট্রাইক হচ্ছিলো। ইউনিয়নের ডাকে লেবার স্ট্রাইক আরম্ভ হলো। পরে মিল মালিকরা মিল লক আউট ঘোষণা করার পর নেতাদের অবস্থা কাহিল হয়ে গেলো। আমরা নেতারা মিলে দিনকয়েক টিন ফুটো করে সেটা খটাং খটাং করে বাজিয়ে ভিক্ষা করে শ্রমিকদের কিছুদিন খাওয়ালাম। ক’দিন আর তাদের খাওয়ানো যায় ! তারপর আমরা লেবার কোর্টে গেলাম। লেবার কোর্ট থেকে বললো যে, একটা ট্রাইবুনাল হবে। সেখানে মালিক পক্ষ থাকবে, শ্রমিক পক্ষ থাকবে এবং সরকারের তরফ থেকে একজন থাকবে। তাদের একজন এই সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে কোর্ট লোকেট করলেন। গান্ধীজীর সঙ্গে ওনার মিশন তখন শেষ হয়ে গেছে। তিনি চুপ করে কলকাতায় বসে আছেন। এখন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বাড়িতে ঐ মিটিং হবে। আমাকে সেই মিটিংয়ে যেতে হলো। আমি শ্রমিক নেতা। রজনীদাও আছেন। রজনীদা আমাদের ফেডারেশনের নেতা। রজনীদার সঙ্গে আবার সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ভালো চেনাশোনা। রজনীদা মানে রজনী মুখার্জী।
প্র: এটা কি পার্টিশনের আগে ?
উ: পার্টিশনের পর, পার্টিশনের বেশ কিছুদিন পর।
প্র: আপনি তখনও চুয়াডাঙ্গায় আসেননি ?
উ: এসেছিলাম। কিন্তু ঘুরে আবার কলকাতায় যাই। তখন কলকাতাতেই থাকি। যাহোক, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বাড়িতে মিটিং। আমরা গেলাম। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন মুসলিম লীগের বড় নেতা। কিন্তু তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মচারির নাম হচ্ছে শিবু। শিবু আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখি যে, কার্পেট বিছানো, আর কার্পেটের উপরে রেকর্ড, গ্রামোফোন ডিস্ক। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের যে গানের প্রতি এতো অনুরাগ ছিলো সেটা জানতাম না। ওনাকে আমি আগে কখনও দেখিনি। আমরা দেখলাম যে, গানের প্রতি ওনার বেশ একটা আসক্তি। অজস্র গানের রেকর্ড সেখানে। আর বই ভর্তি। যাহোক, শিবু আমাদের ওখানে বসালো। বসানোর খানিকক্ষণ পর সোহরাওয়ার্দী সাহেব আসলেন। একদিকে আমরা, একদিকে মালিকপক্ষ। আর উনি মাঝখানে বসে আছেন। আমি যেখানে বসেছি তার সামনে একটা দরজা বেরিয়ে যাবার জন্য। বসে আমরা কথাবার্তা বলছি, হঠাৎ দেখি যে, আমাদের চুয়াডাঙ্গার ডা: মালিক আমার সামনে যে খোলাদরজা, তার সামনে একটা সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনের একটা ঘরে ঢুকে গেলেন। ডা: মালিকের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের খুব ক্লোজ লিংক আছে সেটা আমি জানতাম। কিছুক্ষণ পর দেখি বগুড়ার মোহাম্মদ আলীও ঢুকে গেলেন ঐ ঘরে। এরও কিছুক্ষণ পর টি. আলী ঢুকে গেলেন ঐ ঘরে। এদিকে আমাদের মিটিং চলছে। সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে আমাদের যে দাবিপত্র সেটা আমরা তাঁর হাতে দিলাম। দেয়ার পর উনি কাগজটা দেখলেন। দেখার পর মালিক পক্ষকে বললেন যে, আপনাদের ফয়সালা তো আমার পক্ষে করা সম্ভব না। আমার এখনও মনে আছে, উনি তার সেক্রেটারিয়েট টেবিলে বা হাত দিয়ে ড্রয়ারটা টেনে একটা সাদা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললেন যে, মেক আউট ইউর স্কীম। আমি তো থ! আমার দিকে তিনি আঙ্গুল উঁচু করে বলছেন যে, তোমাদের যা দাবি সেই দাবি অনুপাতে যদি মালিককে ডিমান্ড মিট করতে হয় তাহলে টোটাল কত টাকা মাসিক এবং বাৎসরিক লাগবে। মালিকের বাৎসরিক আয় কত ? ট্যাকসেস দেওয়ার পর কত তার থাকছে ? এই টাকা মিট করার পর মালিকের ঘরে টাকা থাকবে কি থাকবে না বা সমান সমান হবে কিনা এ সব করে তুমি আমাকে দাও। শ্রমিক রাজনীতি করেন এমন যারা সেখানে গিয়েছিলেন, আমি জানি না, কার কি অভিজ্ঞতা হলো। কিন্তু আমার জীবনের অভিজ্ঞতা হলো অনেক। আমার জীবনে লেখা থাকলো যে, শ্রমিক আন্দোলন করতে গেলে অংক কষে দাবিগুলো করা বাঞ্ছনীয়। আমি তখন কি করি ! বেশ বিপদে পড়ে গেলাম। আমি বললাম, আমি এটা কি করে জানবো ! মালিকরা তো সঠিক ফিগার আমাদের দেন না। উনারা ইনকাম ট্যাঙ ফাঁকি দেওয়ার জন্য তো ফলস অ্যাকাউন্ট সাবমিট করেন। আমি তো সঠিক অংক কষতে পারবো না। তখন উনি বললেন, হোয়াটস ইউর নেম ইয়াং ম্যান ? আমি বললাম, আসহাবুল হক। তারপর সোহরাওয়ার্দী সাহেব রজনীদার দিকে তাকিয়ে বলছে, হি ইজ আসহাবুল হক ? ইউ আর এ মুসলিম ইয়াং ম্যান ? তার মানে আমি একটা মুসলমান ছেলে কলকাতায় এসে শ্রমিক আন্দোলন করছি। শ্রমিক ইউনিয়নের আমি সেখানকার প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি। পার্টিশনের পরে তখনও রয়েছি। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের চোখে আমি ভীষণভাবে ধরা পড়ে গেলাম। উনি কথাবার্তা বলে, শ্যামা চা দাও বলে বললেন, একটু বসো, আমি আসছি। দরজা দিয়ে উনি বেরিয়ে গেলেন। যেদিকে ডা: মালিক, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং টি. আলী গেলেন সেই দিকে তিনিও গেলেন। দেখলাম সোহরাওয়ার্দীর বাড়ির পিছন দিকে একটা করিডোর আছে। করিডোরে সব ফুলের টব, তাতে ফুল গাছ ভরা। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাদের তিনজনকে ওখানে ডেকে নিলেন। তারা সবাই কানে কানে কি সব যেন বললেন। তারপর উনি ওনাদেরকে বিদায় করে দিলেন। তারা তিনজন সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেলো। কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতায় খবরের কাগজে দেখলাম, যে ঐ তিনজনই ঢাকায় চলে গেছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মিটিংয়ের দিনটা আমার কাছে ঐতিহাসিক বলে মনে হয় এই জন্য যে, ঐ তিনজনকে তিনি তাঁরই লেফটেন্যান্ট হিসাবে ঢাকায় ডেসপ্যাচ করলেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে অপোজিশন নিউক্লিয়াস হিসাবে ডেসপ্যাচ করলেন। অথচ তাঁরা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেলো, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। আর ডা: মালিক এবং টি. আলী মন্ত্রী হয়েছেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে আমার এভাবেই পরিচয়। উনি আমাকে একদিন দেখেছেন কিন্তু ভোলেননি।
১৯৫৪ সালে আবার তাঁর সাথে দেখা হলো। তখন বললেন, কাম অ্যান্ড সি মি। ইলেকশনের পর উনি তো আবার করাচী থেকে ঢাকায় আসা যাওয়া করতেন। একদিন খবরের কাগজে দেখলাম, উনি ঢাকা এসেছেন। আমি সে সময় ঢাকা গেলাম। ঢাকাতে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হলো। তিনি আমাকে বললেন, কি করছো ? হোয়াট আর ইউ ডুয়িং ? আমি বললাম, তেমন কিছু করছি না। শুধু ডাক্তার হিসাবে পেটের ধান্ধায় আছি। টাকা পয়সা আমার কিছু নেই। দেনা করে একটা ডিসপেনসারি দিয়েছি, দেনা শোধ করার জন্য এখন ব্যস্ত। সোহরাওয়ার্দী সাহেব আমার এ কথা শুনে বললেন, দ্যাটস ভেরি গুড। আই নো ইউ আর ইন অপোজিশন পলিটিকস। হোয়াই ডোনচ্ ইউ জয়েন উইথ আস ? আমি বললাম যে, আমার তো এখন আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সে জন্য পলিটিঙ আর করতে পারছি না। তিনি বললেন, ইটস রাইট, বাট ইউ গিভ সাম টাইম ফর পলিটিঙ। মানি ইজ নট দি ফ্যাক্টর। এর মধ্যে কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটা ড্রপ আউট হয়ে আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ তখন একটা নন কমিউনাল অর্গানাইজেশন হয়ে গেছে। আমি বললাম, স্যার গিভ আস সাম পজিটিভ প্রোগ্রামস ফর দি বেনিফিট অব দি কমন পিপল। এইভাবেই আমি আস্তে আস্তে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। আর ঐ যে ২১ দফা, আমার মতে সেটা আওয়ামী লীগেরই ছিলো। যেহেতু ওটা তখন যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি এবং আওয়ামী লীগ ওয়াজ এ পার্ট অব ইট, সুতরাং এই কর্মসূচির পক্ষে আমি হ্যামার আউট করবো। তখন আওয়ামী লীগে জয়েন করলাম এবং আওয়ামী লীগ অর্গানাইজেশনকে আমি পিপল বেজ অর্গানাইজেশন করার জন্য ডে এন্ড নাইট কাজ করতে লাগলাম।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের চুয়াডাঙ্গাতে তখন কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো ভিত্তি ছিলো না। তাই আওয়ামী লীগকে পিপল বেজ করার জন্য তখন থেকে চেষ্টা শুরু করলাম। চুয়াডাঙ্গা তো এখন ডিস্ট্রিক্ট হয়েছে। তখন ছিলো সাব ডিভিশন। চুয়াডাঙ্গার এমন কোনো গ্রাম নেই যে গ্রামে আমার সাইকেলের চাকার দাগ নেই। আমি রোগী দেখেছি বেলা একটা দু’টো পর্যন্ত। তারপর সাইকেলে করে চলে গিয়েছি গ্রাম থেকে গ্রামে। সেখানে মিটিং করেছি, কন্টাক্ট করেছি, পার্টি ফর্ম করেছি। যারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদেরকে চুয়াডাঙ্গায় নিয়ে এসেছি। এগুলো যখন করছি এবং আওয়ামী লীগ যখন অর্গানাইজেশন হিসাবে বেশ শক্ত, সেই সময়ের একটি ছোট্ট ঘটনার কথা বলি। আতাউর রহমান খান সাহেব তখন মুখ্যমন্ত্রী। উনি মুখ্যমন্ত্রী থাকা কালে একটা অর্ডার দিলেন যে, বর্ডার এলাকার কোনো পাট ভারতে তো যাবেই না, ইনসাইড মার্কেটেও আসবে না। ওখানেই থাকবে। ওখানকার পাট জুট বোর্ড কিনবে এবং ওখান থেকেই কিনবে। ফলে দাঁড়ালো এই, জুট বোর্ড যে দাম দেবে, চাষীকে সেই দামেই পাট বিক্রি করতে হবে। আবার সরকার নির্ধারিত দামও যে চাষীরা পাবে তারও নিশ্চয়তা নাই। তাই আমি সাংগঠনিকভাবে এর প্রতিবাদ করলাম। সেটা আমাদের চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগ থেকেই করা হয়। এরপর সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এই অবস্থার মধ্যেই আমরা এগিয়ে চলছিলাম। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটলো। সোহরাওয়ার্দী সাহেব বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর অধীনে ল’ মিনিস্টার হিসাবে পাকিস্তানের মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করলেন। সেটাকে অনেকেই অনেকভাবে দোষ দিলো। আমি কিন্তু এটাকে দোষের মনে করিনি। আমি মনে করেছি, দেশের স্বার্থে তিনি নিজের সম্মানকে বলীদান দিয়েও দেশকে একটা সংবিধান দেওয়ার জন্যই এই ভূমিকা নিয়েছেন। আমার কাছে এটা খুবই ভালো লেগেছিলো। আমি সেটা সার্পোট করেছিলাম।
তার আগে সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তানের প্রাইম মিনিস্টার হয়েছিলেন। প্রাইম মিনিস্টার হওয়ার পর অ্যাজ ইউজুয়াল পাকিস্তানের ভাগ্যে যা হয়ে থাকে তাই হয়েছিলো। তিনি প্রাইম মিনিস্টার হওয়ার পর একটা ক্রাইসিস আওয়ামী লীগে দেখা দিলো। ক্রাইসিসটা হলো যেই মাত্র উনি প্রাইম মিনিস্টার হলেন সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা বাম মনোভাবাপন্ন ছিলো তারা দাবি তুললো সিয়াটো-সেন্টো চুক্তি বাতিল করো। এতোদিন অন্য প্রধানমন্ত্রী যারা থাকলো তাদের বেলায় চুক্তি বাতিল করার প্রশ্ন উঠলো না। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাথে সাথে বাতিল করো, বাতিল করো আরম্ভ হয়ে গেলো। অথচ তারা জানেন সেই সময় যে ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি ছিলো সেই অ্যাসেমব্লিতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবসহ সর্বমোট ১৩ জন সদস্য ছিলো আওয়ামী লীগের। ১৩ জনের নেতা হয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রীত্ব করছেন এই সহজ সরল কথাটা তদানীন্তন বামপন্থীরা এবং তাদের নেতা বলে পরিচিত মওলানা ভাসানী সাহেব বুঝবার চেষ্টা করলেন না বা বুঝলেন না। উনি বুঝতেও চাইতেন না।
মওলানা ভাসানী প্রায়ই এ রকম কান্ড করতেন। তাঁকে কেন্দ্র করে এর আগে আরেকটা ঘটনা ঘটেছিলো। আতাউর রহমান খান সাহেব যখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি প্রায় প্রত্যেক দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মওলানা ভাসানীর একটা স্টেটমেন্ট খবরের কাগজের মাধ্যমে পেতেন। স্টেটম্যান্টটা ছিলো এই সরকার কিছু করছে না, জনদরদী না, জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে। আতাউর রহমান সাহেব একদিন মওলানা ভাসানীকে সেক্রেটারিয়েটে নিয়ে আসলেন। তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে এসে বললেন, আপনি আমার চেয়ারে বসেন। আমি আজ ইস্তফা দিলাম। আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হলো। আপনি এখন থেকে যা হুকুম করবেন, আমরা তাই পালন করবো। আপনি পার্লামেন্ট মেম্বার নন। আমার যে কনস্টিটিউয়েন্সি সেই কনস্টিটিউয়েন্সি থেকে আমি রিজাইন দেবো। সেখানে বাই ইলেকশনে আপনাকে মেম্বার করা হবে। আপনি দেশ চালাবেন। তখন মওলানা সাহেব বলেন, আতাউর তুমি কি বলছো ! আতাউর রহমান খান তখন বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমাকে খবরের কাগজে দেখতে হয় যে, আমি সবই অন্যায় করছি। আপনি তো একবারও জিজ্ঞাসা করেন নাই আতাউর এটা কেন করছো ? পার্টির স্বার্থে, জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কেন এ কাজ করছো ? তাই আমি আর দোষের ভাগী হবো না। আপনি দেশ চালান, আমি আপনার হুকুম মানবো। এই তো ছিলো তখনকার রাজনীতি ! এর মধ্যে দিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে সামনের দিকে।
এ প্রসঙ্গে আরো কিছু কথা বলতে হয়। সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আবু হোসেন সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তারপরে আতাউর রহমান সাহেবের সরকার। এর মধ্যে কিন্তু আমাদের দেশের খাদ্য পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় গেছে। এই খাদ্য সমস্যাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মাটিতে দু’বার মিলিটারি নেমেছিলো। প্রথমটা হয়েছিলো ‘সার্ভিস ফার্স্ট’ নাম দিয়ে আবু হোসেন সরকারের সময়। আবার আতাউর রহমান সাহেবের সময় হয়েছিলো ‘অপারেশন ক্লোজ ডোর’ নামে। এই অপারেশন ক্লোজ ডোর এবং সার্ভিস ফার্স্টের নামে যা হয়েছিলো তার উপর ভিত্তি করে সোহরাওয়ার্দী সাহেব ঢাকায় মিটিং করেছিলেন। সকলের মতামত যাচাই করার জন্য তিনি সবাইকে সেই মিটিংয়ে ডেকেছিলেন। সেই সভায় আমি এসেছিলাম। তারিখ মনে নেই। তবে সেটা রোজার মাসে হয়েছিলো। মিটিংটা ছিলো বিকালে। স্থানটা ছিলো তখনকার দিনের অ্যাসেমব্লি হল অর্থাৎ বর্তমান জগন্নাথ হল। তারই কমিটি রুমে। সেই মিটিংয়ে আমরা টেবিলের চারপাশ দিয়ে বসেছি। সোহরাওয়ার্দী সাহেব টেবিলের এক মাথায় বসেছেন। তার বাঁ পাশে আতাউর রহমান খান সাহেব বসেছেন, আর ডান পাশে আবুল মনসুর আহমদ সাহেব। তখন আবুল মনসুর সাহেব বেশ অসুস্থ ছিলেন। ছ’জনের ফাঁকে একটা জায়গা ছিলো। তার ভিতরে একটা চেয়ার নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব সেখানে এগিয়ে বসলেন।
প্র: কোন সাল সেটা ?
উ: সোহরাওয়ার্দী সাহেব যখন প্রধামন্ত্রী ছিলেন। আলোচনা শুরু হলো সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশে। ডানদিক থেকে একে একে সবাই সে সম্পর্কে নিজ নিজ মত বলে যাচ্ছেন--সেই সময় জহীরউদ্দীন ছিলো সেন্ট্রাল ফুড মিনিস্টার। সেনাবাহিনী নামানোয় গ্রামে গঞ্জে বা বিভিন্ন জায়গায় বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। যার ফলে আমরা অর্থাৎ আওয়ামী লীগাররা সরাসরি জনসাধারণের চোখের সামনে হেয় হই এবং জবাবদিহি করতে হয়। সবাই সেই প্রতিক্রিয়াটাই ঐ মিটিংয়ে জানাচ্ছিলো। প্রতিক্রিয়া শুনে সেদিন জহীরউদ্দীন তাঁর বক্তব্যের মধ্যে বলেছিলেন যে, আজকের দিনের সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিদেশী নয়। এরা আমাদের নিজেদেরই ভাই, আমাদের দেশের লোক। সুতরাং বিশেষ মনোভাব নিয়ে তাদের দিকে তাকানো ঠিক হবে না। এই কথাগুলো আমার মনে আছে। ঘুরতে ঘুরতে যখন আমার পালা আসলো বক্তব্য রাখার--তখন আমি বললাম যে, বাঘে মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছে, এখন এ দেশের মানুষকে বাঘের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য যে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার আমার মনে হয় সে সম্বন্ধে আমাদের নেতৃবৃন্দ এবং আমাদের কর্মীবৃন্দের সজাগ থাকা উচিত। আমি যখন এ কথা বলছি তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি তা বুঝতে পারলাম না। আমার পরে ডানদিকে যিনি বসে ছিলেন তিনি যশোরের মশিউর রহমান সাহেব। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী। আমার পর তিনি তাঁর বক্তব্য রাখলেন। এমনি করে কয়েকজনের বক্তব্যের পরই আমাদের ইফতারের টাইম হলো। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পরনে সেদিন একটা ডিনার স্যুট ছিলো। তিনি কোথাও হয়তো যাবেন। তো বুফে স্টাইলে ইফতার আরম্ভ হলো। যার যার মতো হাতে প্লেট নিয়েছে। প্লেট নিয়ে আমরা খাচ্ছি। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তাঁর প্লেট হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে সবার সাথে কথাবার্তা বলছেন। এক সময় তিনি আমার কাছে আসলেন। আমার কাছে এসে, তিনি জানা সত্ত্বেও আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইউ আর ফ্রম চুয়াডাঙ্গা ? আমি বললাম, ইয়েস স্যার।
প্র: সেনাবাহিনীকে যদি বেসামরিক কাজে নিযুক্ত করা হয় তবে তার সুদূরপ্রসারী একটা ফল হবে। এর ফলে সেনাবাহিনী হয়তো ক্ষমতা লোভী হয়ে যেতে পারে। সম্ভবত: এই কথাই সেদিন ঐ সভায় আপনি বলতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের কথা সেদিন আর কেউ বলেছিলেন কি ?
উ: না, আর কেউ এ ধরনের কথা বলেননি। আমি নিজেকে বড় করার জন্য নয়। এই কথাটা পরবর্তীতেও আর কারো কাছে শুনিনি। এ জন্য আমি আমার গুরুদেবের কথা স্মরণ করি। তিনি আমাদের মাথায় কিছু বুদ্ধি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। সিচুয়েশনকে এনালাইসিস এবং স্টাডি করে সেটা বোঝার একটা শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছিলেন। আমি তাঁরই শিক্ষা নিয়ে এ কথাটা বলতে পেরেছিলাম সেদিন। পরবর্তী পর্যায়ে ঠিকই আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসলো। তখন আওয়ামী লীগের ধ্বস নামতে লাগলো। সেই সময় ছাত্রদের অর্থাৎ ছাত্রলীগের তরফ থেকে আওয়ামী লীগের অবস্থাটাকে কোনোরকম জিইয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিলো। আর একজন আওয়ামী লীগকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন। কিন্তু তাকে আমি আওয়ামী লীগের মায়ের আসন দেই। তাঁর নাম হচ্ছে তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তিনি কিন্তু নি:শব্দে নীরবে কোনো দায়িত্ব না নিয়ে, সেক্রেটারি বা প্রেসিডেন্ট না হয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে তার কলামের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। আইয়ুব খানের সময় তাঁর ঐ মুসাফিরের কলামে আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি মাঝে মধ্যে ধারাবাহিকভাবে ফ্ল্যাশ করেছেন। আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব বা ভাবমূর্তি বজায় রাখার জন্য সেই সময় মানিক মিয়ার অবদান কিন্তু কম নয়।
এর পরে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বৈরুতে মারা গেলেন। আমার ধারণা তাঁকে হত্যা করা হয়েছিলো। আমার এই ধারণার পিছনে একটা কারণও ছিলো। তখন কিন্তু আর একটা ঘটনা ঘটেছিলো। সেই ঘটনা অল্প কিছু মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। সে সময়কার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বিদেশে যাওয়ার পথে অনির্ধারিতভাবে যাত্রা বিরতি করেন বৈরুতে। ভুট্টো বৈরুতে থাকার সময় সোহরাওয়ার্দী সাহেব মারা গেলেন বা তাকে মেরে ফেলা হলো। তারপর ভুট্টো বৈরুত থেকে অন্য দেশে চলে গেলেন। এই সংবাদ তখন কোনো সংবাদপত্রে বের হলো না। পাকিস্তানের একজন মন্ত্রী বৈরুতে নামলেন, থাকলেন, আবার বিদায় নিয়ে চলে গেলেন--এ খবরটা সংবাদপত্রে কেন বের হলো না সে প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর ব্যাপারে এই ঘটনা আমার মনে সন্দেহের একটা অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে আছে আজো। সোহরাওয়ার্দী সাহেব নাকি তাঁর হোটেলের ঘরের মধ্যে বিছানায় লম্বালম্বিভাবে শুয়ে ছিলেন না। আড়াআড়ি অবস্থায় তাঁকে মৃত পাওয়া গেছে। আমার সন্দেহ হয় তদানীন্তন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বিনা বাধায় দেশ পরিচালানোর জন্য তাঁকে ভুট্টোর মাধ্যমে হত্যা করে। তাদের একমাত্র বাধা ছিলো সিজন পলিটিশিয়ান। সোহরাওয়ার্দী নিজের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে তাঁরই এককালের পলিটিক্যাল সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলীর অধীনে আইন মন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানের কনস্টিটিউশন বিল্ড আপ করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। এমন একজন মানুষকে সরিয়ে দিতে না পারলে, বোধহয় তদানীন্তন সামরিক শাসক এবং তার পদলেহীদের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা অসুবিধা হচ্ছিলো। সেটা মনে করেই আমার মনে হয় তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মারা যাওয়াতে স্বাভাকিভাবেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে একটা ভ্যাকুয়াম ক্রিয়েট হলো। ভ্যাকুয়ামটা কিভাবে ফিল আপ করা যায়, কাকে দিয়ে ফিল আপ করা যায় সেটা নিয়ে নানা মত ছিলো তখন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব যতোদিন ছিলেন ততোদিন কোনো সমস্যা হয়নি। যাহোক, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহকে দিয়ে কোনো রকমে তাল সামলানো হলো।
এক বছর পর সোহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। আমি চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় এসেছি তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে যোগদান করার জন্য। ঢাকা এসে আমি তাঁর কবরের পাশে গিয়ে কতকগুলো ফেস্টুন এবং পোস্টার দেখলাম। সেগুলো সব ওখানে রেলিংয়ের ধারে খাড়া করা ছিলো। আওয়ামী লীগের একটা মিছিল তখন কোথা থেকে ঘুরে ওখানে এসে টার্মিনেট করলো। কিছুক্ষণ পর আতাউর রহমান খান সাহেবের নেতৃত্বে কিছু লোক ঐ ফেস্টুন-পোস্টার নিয়ে আরেকটা মিছিলে বের হলেন। ওখানেই একটা আলোচনা সভার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। প্যান্ডেল বানানো হয়েছিলো। অনেকেই অনেক কথা বললেন। সেদিনকার অর্থাৎ ১৯৬৫ সালের ৫ ডিসেম্বরের সেই আলোচনা সভায় একটা নতুন শব্দ আমার কানে এলো। সেই শব্দটা হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সেটা মানিক মিয়াই বললেন। মানিক মিয়া লিখিত বক্তব্য রাখলেন। সেটা ছাপানো ছিলো। সবাইকে উনি তাঁর বক্তৃতার কপি দিলেন। তারপরে আর একজন বক্তব্য রাখলেন। তিনি হচ্ছেন সিরাজউদ্দীন হোসেন। যিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের হাতে শহীদ হয়েছেন। তিনিও তাঁর বক্তব্যে একই কথা বলেছিলেন। তার কিছুদিন আগে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই হয়তো ওনারা এই কথা বলেছিলেন। ১৯৬৫ সালে যে যুদ্ধ হয়েছিলো সেই যুদ্ধে ভারত যদি পশ্চিম পাকিস্তান আক্রমণ না করে যদি পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করতো তাহলে অবস্থাটা কি হতো ? খালি হাতের এই বাঙালি বা বাংলাদেশের মানুষরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো ? অথচ এই বাঙালিরাই পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচিয়েছিলো।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর আমি নিজে ওয়েস্ট পাকিস্তানের বিভিন্ন ফ্রন্টে গিয়েছিলাম। পাঞ্জাবের শিয়ালকোট এরিয়াতে গিয়ে সেখানকার মানুষের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা আমি বাঙালি জেনে একটা কৃতজ্ঞতার ভাব দেখিয়ে আমার সাথে আলিঙ্গন করলেন। কারণটা কি জিজ্ঞাসা করাতে তারা বললো, যুদ্ধের সময় ওখানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা কোম্পানি বোধহয় ছিলো। ঐদিক দিয়ে ভারতীয় ট্যাঙ্ক বাহিনী গড় গড় করে এগিয়ে আসছিলো। অথচ ট্যাঙ্ক বাহিনীকে বাধা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ওখানে ছিলো না। সেখানকার মানুষের কাছে শুনেছি বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি ছেলেরা নিজেদের শরীরে এক্সপ্লোসিভ ফিট করে ডেডবডির মতো রাস্তার উপর পড়ে থেকেছে। ট্যাঙ্ক আসা মাত্র গড়িয়ে ট্যাঙ্কের তলায় চলে গেছে। নিজের জীবনকে আহুতি দিয়ে ট্যাঙ্ক ব্লো আপ করেছে। সেই যুদ্ধে পশ্চিম ফ্রন্টে বীরত্ব কিন্তু বাঙালিরাই দেখিয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানিরা কিন্তু সেটা দেখাতে পারেনি।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ স্থবির রাজনীতিতে আবার গতি সঞ্চার করলো। আইয়ুব খানের কূটচালভিত্তিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে বিরোধী দল কোনঠাসা হয়ে গিয়েছিলো। তারা যুদ্ধের পর আবার নতুন করে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। বিরোধী জোটগুলো একত্রিত হতে লাগলো। ১৯৬৫ সালের পর সি ও পি অর্থাৎ কমবাইন্ড অপজিশন পার্টি করা হয়েছিলো। যুদ্ধের আগে অন্য একটা নাম ছিলো। পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট নাম ছিলো বোধ হয়। যুদ্ধের পর সর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল মিলে একটা কনফারেন্স ডাকলো লাহোরে। এই কনফারেন্সের আগে শেখ সাহেব জেলে ছিলেন। সে সময় জেল থেকে কেবল বেরিয়েছেন তিনি। তিনি লাহোরের কনফারেন্সে যোগ দেন এবং ৬ দফা কর্মসূচি ওখানে প্লেস করলেন।
প্র: ৬ দফা কর্মসূচি পার্টিতে কখন গ্রহণ করা হয়েছিলো ?
উ: আসলে লাহোরের ঐ কনফারেন্সেই শেখ সাহেব ৬ দফা কর্মসূচিটা উপস্থাপন করেন। পার্টির কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয় ঐ কনফারেন্সের পর। তার আগ পর্যন্ত পার্টির কোনো মিটিংয়ে ৬ দফা গৃহীত হয়নি। এটা নিয়ে সমস্যা হতে পারতো। আমরা যারা আওয়ামী লীগ করতাম তাদের মধ্যে এ নিয়ে গুঞ্জন হয়তো ছিলো। কেউ কেউ বলেছিলো, আমরা কিছু জানতে পারলাম না। যেহেতু ৬ দফা আপামর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো সেহেতু টেকনিক্যাল যে ডিফেক্ট ছিলো সেটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে গেলো। পাশাপাশি মানিক মিয়া এককভাবে তাঁর মুসাফির কলামে এ নিয়ে লিখে ব্যাপক মানুষের কাছে ৬ দফাকে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন। ১৯৫৪ সালের ২১ দফাকে স্ক্যানিং করলে তার মধ্যে ৬ দফা পাওয়া যাবে না। কিন্তু ৬ দফার ভাবটা তার মধ্যে পাওয়া যাবে। আইডিয়াটা সেখান থেকে আস্তে আস্তে কনসেনট্রেট হয়ে ৬ দফা হয়েছে। ৬ দফার ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলন ঢাকার ইডেন হোটেলে হয়েছিলো। সেই সম্মেলনে আমরা এই ৬ দফা সম্পর্কে কোনোরকম টেকনিক্যাল প্রশ্ন না তুলে সবাই সেটা গ্রহণ করেছিলাম। তার আগের আর একটি কথা বলি। সেটা বলতে ভুলে গেছি। সেটা হচ্ছে ১৯৬৪ সালে যখন তার আগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন হচ্ছে তখন আওয়ামী লীগের তরফ থেকে আমি এবং সাদ আহমদ শাহ আজিজুর রহমানের কাছে গিয়েছিলাম। সাদ আহমদ কুষ্টিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। এখন জামাতে ইসলাম করেন। আমরা দু’জন তিন রাত এবং দু’দিন শাহ আজিজুর রহমানের বাড়িতে থেকে তাকে কনভিন্স করিয়ে আমরা আমাদের ১৯৬৪ সালের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে নিয়ে আসি। এই সম্মেলন হয়েছিলো কাঁঠাল বাগানে। সেই সম্মেলনে শাহ আজিজুর রহমান ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
প্র: শাহ আজিজুর রহমান তার আগে কোন্ দলে ছিলেন ?
উ: তার আগে তিনি মুসলিম লীগে ছিলেন। পাকিস্তানের গোটা সময়ে তিনি মুসলিম লীগই করেছেন। কিন্তু সেই বার তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেব মারা যাওয়ার পর আমাদের অর্গানাইজেশনে নওয়াবজাদা নসরুল্লাহকে প্রেসিডেন্ট করা হয়। সেই প্যানেলে শাহ আজিজুর রহমানকে আমরা ভাইস প্রেসিডেন্ট করি। ১৯৬৬ সালে আমরা যখন কনফারেন্স করছি তখন ৬ দফার ব্যাপারে তাঁর সাথে আমাদের মতভেদ হয়। শোনা গেলো, তিনি কনফারেন্সে আসবেন না। তখন আমি নিজে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসি। আমি তাঁকে বলি আপনি ৬ দফার বিরুদ্ধে তাতে অসুবিধা কি ! আপনি আসেন। ইউ টেক ইউর স্ট্যান্ড অ্যান্ড স্পীক ইট আউট। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আপনি এর বিরুদ্ধে যেটা বলবেন সেটা যদি যুক্তিসঙ্গত হয় আমরা গ্রহণ করবো। শাহ আজিজুর রহমানকে ঐ দিন দুপুরে যখন ইডেন হোটেলের কনফারেন্সে আমি ঢোকাচ্ছি তখন দেখি হোটেলের দেওয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাজশাহীর কামরুজ্জামান সাহেব। তিনি তখন ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির মেম্বার। আমি তাঁকেও টেনে প্যান্ডেলের ভেতরে বসানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি বসেননি। আমি তখন তাঁকে বললাম আপনাকে মেম্বার হিসেবে কিছু বলতে হবে না। ভিজিটার্স গ্যালারি আছে আমাদের, সেখানে বসেন। আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন ? আমি কিন্তু তাঁকে ভিতরে নিয়ে যেতে পারিনি।
প্র: কামরুজ্জামান সাহেব তখন কি আওয়ামী লীগে ছিলেন না ?
উ: তিনি তখন আওয়ামী লীগে ছিলেন না। অন্য কোনো পার্টিতে বা ইনডিপেনডেন্ট ছিলেন। ১৯৬৬ সালের সেই কনফারেন্সে আমরা যখন ৬ দফা গ্রহণ করছি তখন সেখানে ভিজিটার্স গ্যালারি চেয়ারেও আমি তাঁকে বসাতে পারিনি। আমি নিজে চেষ্টা করেছি। যাহোক, তারপর ৬ দফা গৃহীত হলো। ৬ দফা গ্রহণ করার পর সে সময় আমরাও অনেকটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি। আর মানিক মিয়ার কলমও তখন জোরেসোরে চলছে। ৬ দফা আপামর জনসাধারণের দরজায় যেতে লাগলো। তারপরই এলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হওয়ার আগে ৬ দফার আন্দোলন তুঙ্গে। তখন অবস্থা এমন হলো শেখ সাহেব ট্রেনে কোথাও যাচ্ছে এই সংবাদ মানুষ পেলে সেই ট্রেন নরমালি রান করতে পারতো না। প্রত্যেক জায়গায় চেন টেনে ট্রেন দাঁড় করিয়ে তাঁর বক্তব্য সেখানকার লোক শুনতো। তাঁর গলায় মালা দিতো সমস্ত মানুষ। তখন মোনায়েম খান গভর্নর। শেখ সাহেব যতো জায়গায় ৬ দফার উপর বক্তব্য রেখেছেন সেখানেই পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। আরো দেখেছি, আমাদের নামে কোনো মামলা নেই, শুধু শেখ মুজিবের নামে মামলা। এক, দুই, তিন, চার করে তাঁর নামে ২৯ না ৩৩টা মামলা হয়ে গেলো সারা দেশ জুড়ে। মোনায়েম খান প্রত্যেক জায়গায় টেলিফোন করে বলেছেন। ফলে একেক জায়গায় একেক দিন মামলার ডেট পড়ে। পুলিশের কাজ হচ্ছে শেখ মুজিবকে নিয়ে আজকে খুলনা, কাল বরিশাল, পরশু দিন রংপুর, তার পরের দিন সিলেট, তার পরদিন চিটাগাং নয় যশোর নিয়ে যাওয়া। এই যখন আরম্ভ হলো তখন কোর্টে মামলা হবে কি ? যেদিন যে কোর্টে শেখ মুজিবকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে সেই কোর্টেই পাবলিক মিটিং হয়ে যাচ্ছে--এই অবস্থা। এই অবস্থা যখন হতে লাগলো তখন মোনায়েম খান বুঝলো বা কেউ তাকে বোঝালো এতো ভুল হয়ে গেলো। এতে শেখ আরো বেশি পপুলার হয়ে যাচ্ছে। তখন বিভিন্ন জেলায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া বন্ধ হলো। শেখ মুজিবকে ঢাকার সেন্ট্রাল জেলে বন্দি করে রাখলো। এর মধ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সংবাদ খবরের কাগজে বেরিয়ে গেলো। আসামীদের নামের তালিকা বের হলো, সাক্ষিদের নামের তালিকা বের হলো। কার বিরুদ্ধে কি চার্জ সেগুলোও মোটামুটি খবরের কাগজে বেরিয়ে আসলো। মামলা শুরু হয়ে গেলো।
আমরা তো খবরের কাগজ পড়ছি। প্রথম দিন গেলো, দ্বিতীয় দিন গেলো, তৃতীয় দিন গেলো, চতুর্থ দিন হঠাৎ রেডিওতে খবর শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী। আসামীদের তালিকায় প্রথম তো শেখ মুজিবের নাম ছিলো না। আসামী করার পর শেখ মুজিবকে আনা হলো ক্যান্টনমেন্টে। পরের দিন ১ নং আসামী তাঁকে করা হলো। শেখ সাহেব যেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হলেন সারা দেশে তখন টাক ডুমা ডুম বেজে উঠলো। সারা দেশে আন্দোলন তুঙ্গে উঠলো। মামলার বিচারপতি পালিয়ে গেলেন। মামলা শেষ হলো ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ক্যান্টনমেন্ট থেকে তাঁকে বাড়িতে পৌছে দেওয়া হলো। এর মধ্যে সার্জেন্ট জহুরুল হককে খুন করা হয়েছে। আমরা তো ভীষণ চিন্তিত ছিলাম, যে কখন কি হয় না হয়। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিব মুক্ত হলেন। আইয়ুব খান পদত্যাগ করলেন। ক্ষমতায় এলো আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। আন্দোলনের চাপে তিনি নির্বাচন দিলেন।
প্র: ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে বলুন ?
উ: ১৯৭০ সালে যে নির্বাচন হলো তাতে ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে আমাদের আওয়ামী লীগ আসন পেলো ১৫৭ টা। দু’টো আসন আমরা পেলাম না। সে দু’টো আসনের একটিতে নুরুল আমিন এবং অপরটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজা ত্রিদিব রায় বিজয়ী হন। তারপরে ১০ জন মহিলা এম এন এ আমাদের ভোটেই নির্বাচিত হন। সুতরাং ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে আওয়ামী লীগের আসন ১৬৭ হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের প্রায় সব আসনেই আমরা বিজয়ী হলাম। প্রাদেশিক পরিষদের একটি আসনে আমিও প্রার্থী ছিলাম। আমিও বিজয়ী হই। যদিও আমি ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে নমিনেশন চেয়েছিলাম।
যাহোক, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন শেষ হলো। ইলেকশন শেষ হওয়ার পর আমাদের আওয়ামী লীগের আনন্দ কোলাহল কাটতে ক’দিন সময় চলে গেলো। আমরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়ে গেছি। বিরোধী দলের ভিতরে একমাত্র ভুট্টো ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। তিনিও পশ্চিম পাকিস্তানের সব সীট পান নাই। মোটামুটিভাবে আমরা খুব বেটার পজিশনে ছিলাম। তারপর সিচুয়েশন এগুতে লাগলো। এর মধ্যে ইয়াহিয়া খান শেখ সাহেবকে তো প্রধানমন্ত্রী ডিক্লেয়ার করে দিলো। ইন দি মিন টাইম আমাদের আওয়ামী লীগের তরফ থেকে একটা কনস্টিটিউশন সাব কমিটি করা হলো। যারা আইনজ্ঞ বা কনস্টিটিউশন সম্বন্ধে যাঁদের ধারণা আছে তাঁদেরকে নিয়ে একটা কমিটি ফর্ম করা হলো। পাকিস্তানের ভবিষ্যত সংবিধান কি হবে সেই নিয়ে তাঁরা শুধু আলোচনা নয় রীতিমতো লেখাপড়া শুরু করে দিলেন। তাঁরা বসতেন বিভিন্ন জায়গায়। এই কমিটিতে ড. কামাল হোসেন ছিলেন, তারপরে ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ছিলেন। আরও কাকে কাকে নিয়ে যেনো কমিটি করা হয়েছিলো। কমিটিতে সেন্ট্রাল অ্যাসেমব্লির এবং প্রভিনশিয়াল অ্যাসেমব্লির মেম্বারদেরকেও নেয়া হয়েছিলো। তখন কিন্তু রাজনৈতিক আবহাওয়াটা ভালো যাচ্ছিলো না। কারণে অকারণে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ইস্ট পাকিস্তানে উস্কানি দিচ্ছিলো। যেমন বিনা কারণে পাক আর্মি বিভিন্নস্থানে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলছিলো। এর পাশাপাশি আর একটা ব্যাপার শুরু হয়। যেমন ঢাকাতে, কথা নেই বার্তা নেই মেডিকেল কলেজের পাশে একজনকে বিহারীরা মেরে ফেললো। পুরনো ঢাকার নবাবপুর রোডের উপর পটাপট ৬ জন বাঙালিকে বিহারীরা চাকু দিয়ে মেরে দিলো বিনা কারণে। এই ব্যাপারগুলো ঘটছিলো। সেই সময় নির্বাচনের রায় বানচাল করার জন্য পাকিস্তান থেকে ট্রেন্ড কমান্ডো পাঠানো হয়েছিলো। যারা এখানে এসে বিহারী এবং পাকিস্তান মনোভাবের লোকদের পারসোয়েড করে বা টাকা পয়সা দিয়ে হাত করে এদেরকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তাদেরকে দিয়ে কাজগুলো করাচ্ছিলো। শেখ সাহেবের এই সময়কার ভূমিকাটা কিন্তু আমার কাছে খুব ভালো লাগে। তখন যে কোনো সময় বাঙালি বিহারী দাঙ্গা লেগে যায় যায় অবস্থা। নবাবপুর রোডের ঘটনার পর তিনি অত্যন্ত শক্তভাবে বললেন যে, খবরদার কেউ যেন কোনো দাঙ্গা করার সাহস না পায়। বিহারীদেরকে বাঙালিরা ঘিরে ফেলেছিলো। তিনি সেটা আটকে দিলেন। কারণ সে সময় একটা অসুবিধা ছিলো। যদি বিপক্ষের উপর কিছু হয় তবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বলবে আওয়ামী লীগই সব করাচ্ছে। বদনামটা আমাদের হবে। দোষটা আমাদের উপর দেওয়া হবে। এভাবে চলতে লাগলো।
তারপর তো সবাই জানেন মার্চ মাসের ৩ তারিখে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বব্লির অধিবেশন হওয়ার কথা ছিলো সেটা ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ স্থগিত ঘোষণা করলেন। আমি সেদিন জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ছিলাম। আমি এই প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির একজন মেম্বার ছিলাম। আমরা সেদিন নারায়ণগঞ্জে মিটিং করছিলাম। আমরা যখন মিটিংয়ের মধ্যে আছি তখন একটা টেলিফোন গেলো যে, ইয়াহিয়া খান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বব্লির অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। ঢাকার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। তখন আমি ওখানকার মিটিং তাড়াতাড়ি শেষ করে দিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম। ঢাকায় আসার পর রাজারবাগের রাস্তাটায় এক ইয়াং ম্যান আমাকে বললো যে, স্যার আপনি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান। অমুক সময় থেকে কারফিউ দিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ১৫ মিনিট টাইম আছে। আমি সাধারণত ঢাকায় এসে গেন্ডারিয়া থাকতাম। দেখলাম ওখানে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে আমার ভায়রার বাসায় চলে গেলাম। ২ মার্চ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে একটা মিটিং হলো। সদর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম মিটিংটাতে। ছাত্র ও যুব নেতারা মিটিং করলো। বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত একটা ফ্ল্যাগ ওখানে ওড়ালো। স্বাধীন বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ। তারা যে ফ্ল্যাগটা ওড়ালো সেটা কিন্তু আমি খারাপভাবে নেইনি। সেদিন থেকে হরতাল আরম্ভ হয়ে গেলো। তারপর শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব ৭ তারিখে মিটিং করলেন। সেই মিটিংয়েও আমি ছিলাম। শেখ সাহেব সে দিনের মিটিংয়ে অনেক দেরি করে আসলেন। সেদিনকার মিটিংয়ের দু’টো ধারা আমার চোখে পড়লো। একটা ধারা আমরা যারা আওয়ামী লীগ করতাম তাদের হাতে ডায়াসটা কন্ট্রোলে নেই। ডায়াসটা তখন মোটামুটিভাবে যুব সম্প্রদায় মানে তোফায়েলদের কন্ট্রোলে। আমি যখন গিয়েছি তখনও শেখ সাহেব আসেননি। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ সেখানে ছোটখাট বক্তব্য রাখেননি তা নয়। কিন্তু সেখানে বক্তব্য রাখে ইয়াংগার জেনারেশনই বেশি। এটা আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলাম। কিন্তু আমি ওটা আমলে নিলাম না। ভাবলাম শেখ সাহেবের আসতে দেরি হচ্ছে, একটু সময় কাটুক। কিছুক্ষণ পরই অনেকগুলো পশ্চিম পাকিস্তানি লোক ওখানে এলো। তাদের কারো কারো সাথে সশস্ত্র প্রহরী। তারা একদম ডায়াসের সামনে বসে গেলো।
প্র: এরা কারা ?
উ: পশ্চিম পাকিস্তানে যারা আমাদের সাপোর্টার ছিলো তারা এবং সেখানকার কিছু নির্বাচিত প্রতিনিধি। অপজিশন পার্টিরও কিছু ছিলো। ওর ভিতর এক লোক আমার পরিচিত ছিলো। সে বেলুচিস্তানের। শেখ সাহেব মিটিংয়ে এসে তাঁর সেই বিখ্যাত ভাষণ দিলেন। টিক্কা খান কিন্তু সেদিনই ঢাকায় এসেছেন।
প্র: টিক্কা খান কি আগে থেকে ঢাকায় ছিলেন না ?
উ: ঢাকায় ছিলো না। সেদিনই সে ঢাকায় এসেছে। ঢাকায় এসে এয়ারপোর্টে বসে ছিলো। আমাদের এগ্রিকালচারাল ডিপার্টমেন্টের একটা প্লেন ছিলো সেই সময়। সেই প্লেনটায় উঠে সে মিটিংটার উপর দিয়ে উড়ে সব দেখেছে। অবশ্য এটা আমরা পরে জেনেছি। তখন শেখ সাহেব বক্তব্য রাখছিলেন। যাহোক, যুবকরা মোটামুটিভাবে চাচ্ছিলো সেদিনই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হোক। শেখ সাহেব অনেকক্ষণ বক্তৃতা দিয়ে আস্তে আস্তে তাঁর বক্ততা কনক্লুড করতে লাগলেন। শেষ দিকে এসে উনি প্রথমে বললেন যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। ঐ কথা বলার পর বললেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর তাঁকে বলা হলো রেডিও তাঁর বক্তৃতা ব্রডকার্স্ট করেনি। সেদিন শেখ সাহেবের বক্তৃতা রেডিওতে ব্রডকাস্ট হওয়ার কথা ছিলো। রেডিওতে যারা কাজ করছিলো তাদের উপর তিনি তখনই একটা নির্দেশ দিয়ে দিলেন যে, তোমরা কেউ রেডিও-র সঙ্গে যোগাযোগ রাখবা না। ফলে রেডিও বন্ধ হয়ে গেলো। রেডিও একদম ডেড পরের দিন পর্যন্ত। শেষপর্যন্ত রেডিওর অথরিটি একেবারে বাধ্য হয়ে পরদিন তাঁর বক্তৃতা ব্রডকাস্ট করেন। তাঁর বক্তৃতা প্রচার করা হবে এই কন্ডিশন দিয়ে সেদিন যারা রেডিওর বাঙালি কর্মচারি ছিলো তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছিলো এবং শেখ সাহেবের বক্তৃতার টেপ তাদের দিয়ে বাজানো হয়েছিলো।
৭ তারিখের পর সিচুয়েশন ডাউন করলো বলে আমার মনে হলো না। কিন্তু পাকিস্তানিরা আরও গরম হতে লাগলো। এর মধ্যে বিনা কারণে আরো নরহত্যা হলো। এই হতে হতে সম্পূর্ণ দেশ তো অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যদিয়ে চললো। এর মধ্যে আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। ২ মার্চ তারিখে আমি যখন ইউনিভার্সিটির মিটিং শেষে ফিরে যাচ্ছি তখন আমার পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা হলো। সে সিএসপি অফিসার ছিলো। তার নাম এইচ. আর. মালিক। তাঁর বাড়ি চুয়াডাঙ্গাতেই। সে আমাকে বললো, তোমার সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আছে। চলো আমার বাড়িতে। তখন আমি তাঁর বাড়িতে গেছি। সে আমাকে বললো, তুমি গিয়ে শেখ সাহেবকে বলো পীরজাদা, টিক্কা খান এবং এখানকার গভর্নরের মিলিটারি সেক্রেটারি হিসাবে যে লোকটা আছে তাদের ইমিডিয়েটলি ইয়াহিয়ার পাশ থেকে সরিয়ে দিতে। এই তিনটা লোককে ইয়াহিয়ার পাশ থেকে না সরালে কোনো সলিউশন হবে না।
প্র: এইচ. আর. মালিকের পরিচয়টা জানাবেন কি ?
উ: এইচ. আর. মালিক ডা: এম. এ. মালিকের আপন চাচাতো ভাই। চাচাতো ভাই হলেও তারা আপন ভাইয়ের মতোই ছিলো। সেদিন ২ তারিখ ছিলো। ৩ তারিখে আমি শেখ সাহেবকে এইচ. আর. মালিকের কথাটা বলে আসলাম।
প্র: তাতে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের কি রিঅ্যাকশন হলো ?
উ: আমি তাঁকে বলার পর তাঁর কোনো রিঅ্যাকশন দেখার সময় আমার ছিলো না। তিনি তখন বেশ ব্যস্ত। তারপর তাঁর সাথে ৮ মার্চ তারিখে আমার একবার দেখা হয়েছিলো। সেদিনও তিনি ব্যস্ত। এদিকে ৯ তারিখে আমি চুয়াডাঙ্গা যাচ্ছি শুনে ওখানে আমাদের দলীয় লোকজন অলরেডি পাবলিক মিটিংয়ের আয়োজন করেছিলো। সে জন্য আমাকে দ্রুত চুয়াডাঙ্গা যেতে হয়। চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে দেখি তারা আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। একজন কর্মী আমার ব্যাগ নিয়ে বাড়ি চলে গেলো। আর ওরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে মিটিংয়ে গেলো। এ প্রসঙ্গে আবার মানিক মিয়ার কথা মনে পড়ছে। মানিক মিয়া আজ বেঁচে নেই। মানিক মিয়া সারা জীবন ধরে ঐ মুসাফিরের কলামটা লিখেছেন। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা বা কর্মী কিন্তু ইত্তেফাকে তাঁর কলাম পড়ে সভাতে কি কি কথা বলতে হবে সেটা তারা ঠিক করতেন। সমস্যা কিছু দেখা দিলে মানিক মিয়ার ঐ মুসাফিরের কলামটা পড়েই কিন্তু তা সমাধান করতেন। সেই মানিক মিয়া আজ আর নেই। আমার ধারণা মানিক মিয়াকেও মেরে ফেলা হয়েছে।
প্র: আপনার এ ধারণা কেন হলো ?
উ: সে সময় মানিক মিয়া পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ছিলেন। একটা হোটেলে ছিলেন। যেদিন তিনি মারা যান সেদিন তাঁর নাকি বাইরে যাবার কথা ছিলো না। মানিক মিয়াকে একজন টেলিফোন করে হোটেল থেকে ডেকে এক জায়গায় নিয়ে যায়। মানিক মিয়া ঐ লোকের পাঠানো গাড়িতে সেখানে যান। সেখানে যাওয়ার পর মানিক মিয়াকে নাকি একটা ড্রিংকস দেওয়া হয় খাওয়ার জন্য। সেটা খাওয়ার পর আর তিনি কথা বলেননি। আমার ধারণা মানিক মিয়াও পাকিস্তানিদের হত্যা ও ষড়যন্ত্রের শিকার। সেই হত্যা এবং ষড়যন্ত্রের ছায়া বাংলাদেশে দেশ স্বাধীনের পর ভর করেছে। যাহোক, ঐ সময় আওয়ামী লীগকে কোন্ পথে এগুতে হবে সে ডাইরেকশন দেওয়ার মতো কেউ ছিলো না। আমাদের নিজেদের তা ঠিক করে নিতে হতো। আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রিপারেশন নিয়েছিলো কিনা বা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে তাদের চিন্তাভাবনা কি ছিলো-এ সব প্রশ্ন আজকে অনেকে করে থাকেন। সে সময় আওয়ামী লীগ যারা করতো, তারা ৬ দফা ভিত্তিক পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র তৈরি করার জন্যই রাজনীতি করতো বলে আমি মনে করি। আমিও তাঁদের মধ্যে একজন ছিলাম। এই দেশ স্বাধীন হবে এ কথা মাথার ভিতরে আসেনি তা নয়। কিন্তু এ নিয়ে সেই মূহূর্তে মাথা ঘামাবার অবস্থা ছিলো না। আমার তখন পজিশন ছিলো দেশের দেশের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। শেখ সাহেব ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করছেন। কিন্তু ফলাফল কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন খবরের কাগজে একটা ছবিসহ নিউজ আসলো। এখন যেটা শেরাটন হোটেল, তখনকার দিনে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঐ দিকটায় শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে, সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন আলোচনার ফলাফল সম্বন্ধে। তিনি সেখানে উত্তর দিয়েছিলেন, ফলাফল যদি না-ই আশা করা করবো তাহলে বৈঠকে বসছি কেন ? আমরাও সেটা মনে করেছিলাম। কিন্তু কোথায় যেন একটা রহস্য ছিলো। সেটা তো কেউ জানতো না ! ৬ দফার ভিত্তিতে আলোচনা হচ্ছে। অনেক পরে সম্ভবত: ২২ মার্চের দিকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইয়াহিয়া খান রোজ রোজ বৈঠক করছেন, এটা করছেন, সেটা করছেন, সেটা আসলে ভাঁওতা। হি ইজ কিলিং দি টাইম।
প্র: জাস্ট টু গেইন টাইম ?
উ: ইয়েস, জাস্ট টু গেইন টাইম। এটা আমরা বুঝতে পারলাম। আবার সঙ্গে সঙ্গে আমি ডা: আসহাবুল হক এটাও ভাবছি লেট আস হোপ ফর দি বেস্ট। আমার সে সময়কার বক্তব্যই ছিলো, লেট আস হোপ ফর দি বেস্ট অ্যান্ড গেট প্রিপারড ফর দি ওয়ার্স।
প্র: কি ধরনের প্রস্তুতি ?
উ: প্রিপারেশন, সেটা কিন্তু ইনডিভিজুয়াল প্রিপারেশন। মিস্টার এক্স ইজ সামহোয়ার ইন রংপুর। হি ইজ টেকিং হিজ ওন প্রিপারেশন। আই অ্যাম ডা. আসহাবুল হক, আই অ্যাম সামহোয়ার ইন চুয়াডাঙ্গা। আই অ্যাম টেকিং মাই ওন প্রিপারেশন।
প্র: এই প্রিপারেশনের ব্যাপারে দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত ?
উ: নো, নো। কোনো সিদ্ধান্ত ছিলো না।
প্র: কেন ছিলো না সেটা যদি একটু ব্যাখ্যা করেন ?
উ: বিকজ দেয়ার ওয়াজ নো ডিসিশন হোয়াট সো এভার লাইক দিস ব্লো। উই আর গোয়িং ফর এ কনস্টিটিউশন এবং দ্যাট কনস্টিটিউশন অ্যাসেমব্লি’র যারা মেম্বার হয়েছে তারাই বিল্ড আপ করবে। দ্যাট ওয়াজ আওয়ার লাস্ট থিংকিং।
প্র: কিন্তু অনেকেরই তো মনে হয়েছিলো এই বৈঠক নেহায়েৎ লোক দেখানো এবং সময় নেওয়ার জন্য। আসলে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের জনগণের উপর চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই অবস্থাকে মোকাবেলা করার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তখন কোনো কৌশল বা নীতি আপনারা গ্রহণ করেননি কেন ?
উ: এই যে ব্যাপারটা, যে সময় নষ্ট করা হচ্ছিলো এবং পাকিস্তানিরা প্রিপারেশন নিচ্ছিলো, এ সত্যি কথা। পরবর্তী ইতিহাস সেটাই সাক্ষ্য দেয়। আমি আসহাবুল হক আওয়ামী লীগ করতাম। আমি যেটা আশা করেছিলাম সেটা ভুল। এই ভুলটাও কিন্তু ঠিক।
প্র: আপনার ভুলটা যে ঠিক সেটা কিভাবে ?
উ: এ প্রসঙ্গে অনেক প্রশ্ন আসে, অনেক কথা আসে। এই যে ব্যাপারটা, অর্থাৎ ২৫ মার্চের যে ঘটনা আলটিমেটলি ঘটতে চলেছে - সেটা মাথায় রেখে আমি তখন প্রতিদিন একটা করে পাবলিক মিটিং করে বেড়াচ্ছি আমার এলাকায়। দুই, আমার ওখানে তখনকার দিনের ই পি আর বর্তমানে যেটা বিডিআর, সেই ইপিআরে যারা বাঙালি ছিলো তাদের সাথে আমি কিন্তু কন্টাক্ট করতে শুরু করেছিলাম। তাদের মধ্যে বিশেষত: যারা কমান্ডে ছিলো তাদের ভাব বোঝার চেষ্টা করছিলাম। আবার ওদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানি যারা ছিলো, তাদের থেকে একটু দূরে থাকছি। আমার আবার একটা সুবিধা ছিলো-সে সময় চুয়াডাঙ্গার ইপিআরে ২ জন, অফিসার ছিলো--তাদের একজন মেজর, একজন ক্যাপ্টেন। দু’জনই বাঙালি ছিলো। একজন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী আর একজন ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী। একদিন শুনলাম চুয়াডাঙ্গা ইপিআরে পশ্চিম পাকিস্তানের আর একজন ক্যাপ্টেনকে ডেপুট করা হচ্ছে। সাধারণত: ওখানে দু’টি পোস্ট। একটা মেজর একটা ক্যাপ্টেন। তখন দেখা যাচ্ছে আর একজন ক্যাপ্টেনকে অ্যাডিশনাল পোস্টিং দেয়া হচ্ছে। যাহোক, আমি ইপিআরদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ রাখি। আমার সেই ফরমূলাতে অর্থাৎ গেট প্রিপারড ফর ওয়ার্স। মেজর ওসমান অ্যান্ড আজম চৌধুরী ইজ অ্যান আর্মি ম্যান। ভাবলাম ইট ইজ বেটার, ইফ আই কীপ ইন টাচ উইথ দেম। আই ট্রায়েড টু ফাইন্ড হিম আউট অ্যান্ড আই সাউন্ড দেম হোয়াট দে ওয়্যার থিংকিং। মেজর ওসমান তখন থাকতো চুয়াডাঙ্গার ডাকবাংলাতে। আমি ডাক বাংলার যে চৌকিদার তাকে আমার এজেন্ট হিসেবে বলেছিলাম, সন্ধ্যার পরে তুই ব্যাটা, মেজর ওসমানের কাছে গিয়ে বসে থাকবি হুকুম শোনার ভাব নিয়ে। আর সে কি বলে না বলে সেসব আমাকে বলবি। এই ছেলেটা আমাকে একদিন সংবাদ দিলো ওদের ভিতর প্রতিদিন আলোচনা হয়। সেই আলোচনার ভিতরে বেগম ওসমান থাকেন। অর্থাৎ মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রী। সেই নাকি সব সময় আলোচনায় বলে, এই অবস্থার ভিতরে পাকিস্তানের সাথে আমাদের লড়াই করতে হবে। মেজর ওসমান নাকি বলে, পাকিস্তানিদের সঙ্গে লড়াই করা সোজা কাজ নাকি ! কি দিয়ে লড়াই করবা ? জানো, পাকিস্তানের হাতিয়ার কতো আছে, খোঁজ রাখো ? ফস করে বলছো, লড়াই করবো ? বললেই কি লড়াই হয়ে গেলো ! বেগম ওসমান নাকি বলেন যে, আমাদের হাতে যা আছে, তাই নিয়ে লড়াই করবো। ওসমান বলেন যে, তোমার খুন্তি দিয়ে তুমি কি রাইফেলের বিরুদ্ধে লড়াই করবা ? এমনি করে স্বামী স্ত্রীর কথা হতো। আমি এ সব শুনতাম। ওসমানের সঙ্গে সামনা সামনি কোনোদিন দেখা হয়নি। একদিন আমি মিটিংয়ে যাওয়ার সময় মেজর ওসমানের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলো। তাঁর গাড়িতে আর একজন ছিলো। ওসমান আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলো। ফরমাল পরিচয়। আমি তাঁকে বললাম যে, তোমার সাথে একদিন কথা বলতে চাই। সে বললো, ঠিক আছে। আমি বললাম, ওকে, উই শ্যাল মিট ডে আফটার টুমরো - বলে তাকে বিদায় দিলাম। তারপর থেকে আমি মিটিং করে বেড়াচ্ছি।
২৫ মার্চ আমি চুয়াডাঙ্গা আওয়ামী লীগের এক্সটেন্ডেড মিটিং ডেকেছিলাম। মানে টু দি র্যাংক অব ইউনিয়ন কাউন্সিল। ইউনিয়ন কাউন্সিল লেবেলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি শুরু করে থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি প্রেসিডেন্ট, ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বার’স, ডিস্ট্রিক্ট আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট এবং টাউন কমিটির সবাইকে ডেকেছিলাম। চুয়াডাঙ্গা তখন রাজনৈতিক জেলা ছিলো। মিটিং করে আমরা সবাই আলাপ আলোচনা করলাম। আলাপ আলোচনা করে সবাইকে বললাম যে, ঘটনার অবনতি হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমি এলাইড ফোর্স-এর পক্ষে ছিলাম। সেই সময় ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের যে ভূমিকা ছিলো, তার উপরে যে বইগুলো বেরিয়েছিলো সেগুলো আমি তখন পড়তাম। সকলে মিলে দল বেঁধে পড়তাম, আলোচনা করতাম। ২৫ মার্চে এই মিটিং আয়োজন করেছিলাম এই কারণে যে, আমাদের একটা দায়িত্ব ছিলো সার্বিক অবস্থা কি সেটা দলের নিচের স্তরের নেতা-কর্মীদের বোঝানো, জানানো এবং দেশের সার্বিক অবস্থার একটা ছবি তাদের সামনে তুলে ধরা। এর পাশাপাশি আমাদের করণীয় কিছু আছে কিনা, করণীয়ের মধ্যে আমার একটা স্লোগান ছিলো সে সময়, লেট আস হোপ ফর দি বেস্ট অ্যান্ড গেট প্রিপেয়ার্ড ফর দি ওয়ার্স। এখন ওয়ার্সের জন্য প্রিপারেশন যদি নিতেই হয় তাহলে আমাদের কাজটা কি ? এই ধরনের উদ্যোগ দেশের আর কোথাও বোধহয় নেওয়া হয়নি। আমি নিজের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য বলছি না। সাধারণ মানুষের যে প্রতিরোধ অর্থাৎ পিপল ওয়ার বলা যেতে পারে সে রকম কিছু করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করণীয় ছিলো বলে আমার মনে হয়নি। সেদিন আর বেশি চিন্তাও করতে পারিনি। আমি আমার মহকুমা থেকে আরম্ভ করে ইউনিয়ন ভিত্তিক সমস্ত কর্মী এবং নেতাদেরকে সেভাবেই ব্রিফ করেছিলাম। যদি মিটমাট হয় ভালো। আর যদি না হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি আমাদের উপর আঘাত হানে, তাহলে আমাদের কি কি করণীয়। তাদের বললাম, প্রথম ধাপে আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হচ্ছে, প্রধান চলাচলের রাস্তা, যেমন যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে চুয়াডাঙ্গা আসতে হলে ঝিনাইদহের পথ দিয়ে সৈন্যরা আসবে। কুষ্টিয়া মেহেরপুর দিয়ে যদি চুয়াডাঙ্গা আসতে হয় তবে মেহেরপুর দিয়ে আসবে। সুতরাং আমাদের এই দু’টো রাস্তা গাছ কেটে বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের তো তখন ব্রিজ ধ্বংস করার মতো কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। সুতরাং গাছ কেটে রাস্তার উপর ফেলে দিতে হবে। পাকিস্তানি সৈন্যরা গাড়ি নিয়ে যাতে চুয়াডাঙ্গা ঢুকতে না পারে। আর ওরা গাড়ি নিয়ে যখন গাছের গুড়িগুলো সরাতে চেষ্টা করবে তখন আমরা কোনো না কোনোভাবে আমাদের কর্মীদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে যাবো যে, তারা আমাদের পথে এগিয়ে আসছে।
এটা ছিলো আমার একক সিদ্ধান্ত। তখন আমাদের যতোই কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ থাক, ওয়ার্স সিচুয়েশনের জন্য আমাদের কোনো নেতার কাছে পার্টির কোনো নির্দেশ ছিলো না কিংবা তেমন নির্দেশ আমাদের কাছে পৌঁছায়নি। সত্যি বলতে কি আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হতে লাগলাম। আমাদের সেই সময়কার দৈনন্দিন কর্মসূচির ভিতরে প্রতিদিন বিকালে আমরা যে কোনো একটা এলাকায় জনসভা করতাম। জনসাধারণকে এই কথাগুলি আমরা বোঝাতাম। জনগণের মধ্যে যাতে একটা মানসিক প্রস্তুতি থাকে সে জন্যে স্থানীয় নেতাদের একটা চেষ্টা করতে বলেছিলাম।
চুয়াডাঙ্গার এন্টার আওয়ামী লীগ অর্গানাইজেশন আমার এই ধারণার পক্ষে ছিলো। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বাইরেও এক ধরনের মানুষ ছিলো। তারা আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলো। এ ছাড়া জ্ঞানী গুণী সমাজ ছিলো, বুদ্ধিজীবী সমাজ ছিলো। তাদের সঙ্গেও আমার