নাম
: বেণীলাল দাশগুপ্ত
পিতা
: বীরেনমোহন দাশগুপ্ত
গ্রাম
: কুন্দিহার,
ইউনিয়ন
: বানারিপাড়া,
ডাক
: বানারিপাড়া
থানা
: বানারিপাড়া,
জেলা
: বরিশাল
শিক্ষাগত
যোগ্যতা : বি. এ.
১৯৭১
সালে বয়স : ২৯
১৯৭১
সালে পেশা : স্কুল
শিক্ষক
বর্তমান
পেশা : চাকরি
প্র:
১৯৭০ সালের নির্বাচন
এবং তার পরবর্তী
ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে
আপনি কি জানেন
?
উ: তখন আমি
ভাসানী ন্যাপের
সক্রিয় সদস্য ছিলাম। বর্তমানে অবশ্য
আমি কোনো দলের
সদস্য নই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের
পূর্বে খুলনায়
যখন আমাদের এ ব্যাপারে
কাউন্সিল মিটিং
হয় তখন আমাদের
ভিতর নির্বাচন-ইস্যুতে
দুই দল হয়ে যায়। এক দল নির্বাচনের
পক্ষে ছিলেন এবং
অন্য দল বিপক্ষে
ছিলেন। আমি
নির্বাচনের বিপক্ষে
ছিলাম। তৎকালীন পাকিস্তানের
রাজনৈতিক অবস্হার
পরিপ্রেক্ষিতে
এই নির্বাচন খুব
কার্যকর হবে বলে
আমরা মনে করিনি। এই জন্য আমরা
এর বিরোধিতা করেছি
এবং নির্বাচনকে
আমরা বয়কট করেছিলাম। আমরা মনে করতাম
যে,এমন একটা
কিছু হতে যাচ্ছে
যেটা কোনো ইলেকশনের
রাজনীতি দিয়ে সমাধান
হবে না। আমরা
মনেপ্রাণে একটা
সশস্ত্র
সংগ্রামের
কথা তখন থেকে ভাবছিলাম। তবে পরবর্তীকালে
এটা যে স্বাধীনতার
রূপ নেবে এভাবে
হয়তো আমরা বিষয়টি
পরিষ্কারভাবে
ভাবিনি। নির্বাচনে আওয়ামী
লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ
আসন লাভ করলো। এই ইলেকশনের
রেজাল্টটা অবধারিত
ছিলো। আমাদের
পূর্ব পাকিস্তানের
জনপ্রতিনিধিদের
হাতে ক্ষমতা না
দেওয়ার ফলে সংকটজনক
পরিস্হিতির সৃষ্টি
হলো। আমরা এই
পরিস্হিতিতেই
মোটামুটিভাবে
এই মনোভাব পোষণ
করতাম যে,তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তানে একটা
কিছু ঘটবে। হয়তো বা সেটা সশস্ত্র
সংঘর্ষে রূপ নেবে। অথবা একটা
বিপ্লব আকারেও
হতে পারে। আমাদের তাতে অবদান
রাখতে হবে-আমাদের
এই মনোভাবটা ছিলো।
প্র:
১৯৭১ সালের মার্চ
মাসে আপনার কি
মনে হয়েছিলো এবং
আপনার এলাকার মানুষের
মনোভাব কি ছিলো
?
উ: আমাদের
দেশে জনসাধারণ
অতো শিক্ষিত ছিলো
না। তবুও আমরা
যারা সচেতন ছিলাম
তারা মুক্তিযুদ্ধ
চাইতাম। আমরা ৭ মার্চে
বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায়
কিছুটা নির্দেশ
অথবা নির্দেশনা
পেয়েছিলাম। জনসাধারণের
মধ্যে আমরা এটাকে
কাজে লাগাতে চেষ্টা
করলাম। জনসাধারণের
মনোভাব আমরা এ
ভাবেই সংগঠিত করতে
চাইলাম। বাংলাদেশ অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তানের উপর
নিপীড়ন নিশ্পেষন
অবহেলা বা উপেক্ষা
এটার একটা অবসান
হওয়া দরকার,আমরা ওদের
সাথে এখন আর একত্র
থাকতে পারবো না-এমন
সব ভাবনা মানুষের
মধ্যে কাজ করছিলো। তাই স্বাধীনতার
স্বপক্ষে একটা
আন্দোলন গড়ে তোলার
চেষ্টা করলাম। এই সময় আমরা
আন্দোলন চালাতে
লাগলাম। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধের
সময় দেখা গেলো,যে আন্দোলন
আমরা ইতিমধ্যে
সৃষ্টি করেছি সেটা
আমাদের অনেক দূর
এগিয়ে নিয়ে গেলো।
প্র:
১৯৭১ সালের ৭ মার্চে
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের
বক্তৃতা আপনি শুনেছিলেন
কি ? আপনার
তখন কি মনে হয়েছিলো
?
উ: আমি ১৯৭১
সালের ৭ মার্চে
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের
সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা
শুনেছি। বঙ্গবন্ধুর কথা
বা বক্তৃতাকে ঠিক
স্বাধীনতার ডিকলারেশন
বলবো না। কিন্তু এটা একটা
দিক নির্দেশনা
ছিলো। স্বাধীনতার
কথা,মুক্তির
কথা তিনি যেভাবে
বলেছিলেন,এটাকে হয়তো
প্রচ্ছন্নভাবে
একটা স্বাধীনতা
যুদ্ধের কথাই বলা
হয়েছিলো। কিন্তু যুদ্ধ
করতে গেলে যে সমস্ত
প্রক্রিয়া,প্রস্তুতি
দরকার, সেই প্রক্রিয়া
এবং প্রস্তুতি
তখনও আমাদের ছিলো
না। তবুও আমরা
মোটামুটিভাবে
মানসিক দিক থেকে
একটা প্রস্তুতি
নিচ্ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর
ভাষণ আমাদের একটা
সহায়ক শক্তি হিসাবে
মুক্তিযুদ্ধের
চেতনার উন্মেষ
ঘটায়। যার
ফলে আমাদের স্বাধীনতার
পক্ষে জনসাধারণের
ভেতর একটা চেতনার
সঞ্চার ঘটে। আমি সেদিন
ঢাকাতেই ছিলাম। রেসকোর্স ময়দানে
আমি ঐ লক্ষ লক্ষ
লোকের ভিতরে তাঁর
ভাষণ শুনেছি। আমরা যেহেতু
রাজনীতি করতাম,রাজনীতি
সচেতন ব্যক্তি
হিসাবে আমরা সেই
ভাষণে একটা দিক
নির্দেশনা পেয়েছিলাম। যেটা আমার
নেতা মওলানা ভাসানী
বহু আগেই চেয়েছিলেন। আমরা এটাকে
নিরবচ্ছিন্ন একটা
আন্দোলন হিসাবে
গ্রহণ করেছিলাম। যদিও আমরা
আওয়ামী লীগ করতাম
না। ভাসানী ন্যাপের
একজন সক্রিয় সদস্য
হিসাবে বঙ্গবন্ধুর
ডাকে সাড়া দিয়েছি। এই ভাষণের
ভেতরে একটা ইতিবাচক
দিক ছিলো বলে তখন
মনে করেছি।
প্র:
পাকিস্তানি বাহিনীর
১৯৭১ সালের ২৫
মার্চের আক্রমণ
সম্পর্কে আপনি
কি শুনেছিলেন ?
উ: আমি তখন
আমার স্কুলে ছিলাম। ১৯৭১ সালের
২৫ মার্চ আমি আমার
গাবা স্কুলের হেডমাস্টারের
কোয়ার্টারে ছিলাম। ওখানে আমরা
পরদিন রেডিওতে
বি.বি.সি,ভয়েস অব আমেরিকার
সংবাদ এবং ভারতীয়
সংবাদে ঢাকায় যে
ক্র্যাকডাউন হলো
এ সমঙর্কে খবর
পেলাম। আমার
তখন মনে হয়েছিলো
যে,হয়তো ঢাকায়
গণহত্যা,নির্বিচার
নৃশংস হত্যাকান্ড
ঘটে চলেছে। এ সব সংবাদে আমরা
মোটামুটি ধরে নিয়েছিলাম
যে এটা একটা সশস্ত্র যুদ্ধের রূপ নেবে।
প্র:
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি
বাহিনীর আক্রমণের
পর আপনি কি করলেন
?
উ: ১৯৭১ সালের
২৫ মার্চ রাতে
ঢাকার পতনের পর
পাকিস্তানি বাহিনী
বাংলাদেশের বিভিন্ন
জায়গা যখন আক্রমণ
করলো তখন আমাদের
বরিশালও আক্রান্ত
হলো। আমি তখন
গাবা স্কুলে হেডমাস্টারি
করতাম। ওখানে
আমি দেখতে পেলাম
হাজার হাজার লোক
ঢাকা থেকে,বিভিন্ন
জায়গা থেকে চলে
আসছে। বিশেষ
করে আমাদের এই
বিল অঞ্চলটায়। আটঘর-কুরিয়ানা
ইউনিয়ন অঞ্চল,স্বরূপকাঠি
থানা অঞ্চলের কিছু
এলাকা এবং ঝালকাঠি
থানার কিছু অঞ্চল
এই এলাকার আওতাভুক্ত। বলা যায়, পুরোটা বিল
অঞ্চল। এটা
দুর্গম এলাকা। এই এলাকায়
৩৭টি গ্রাম রয়েছে। যারা শহরের
মানুষ তারা সব
এদিকে আসতে লাগলো। তাদের ধারণা
ছিলো যে,এই বিল অঞ্চলে
পাক বাহিনী হয়তো
আক্রমণ করতে আসবে
না। যেহেতু পাকিস্তানিরা
পানি কাদা সম্পর্কে
অভিজ্ঞ না। এই অঞ্চলের গ্রামগুলির
মধ্যে রয়েছে সুপারি-পেয়ারা
বাগান,আখখেত ইত্যাদি। সব সময় দেখা
যায় যে,এই বিল অঞ্চলটায়
বর্ষাকালে দশ থেকে
বারো হাত পর্যন্ত পানি জমা থাকে। এতো কাদা পানির
ভিতর হয়তো আর্মি
আসতে পারবে না
এমন ধারণা মানুষের
ছিলো। এই বোধ
থেকেই অনেক মানুষ
নিরাপদ আশ্রয়ের
জন্য এখানে আসতে
লাগলো। হাজার
হাজার মানুষ। এর মধ্যে এপ্রিল
মাসেই বরিশালের
পতন হলো। বরিশাল পতনের
পর দেখা গেলো স্হানীয়
দুষ্কৃতিকারীরা
ডাকাতি,রাহাজানি,খুন সহ বিভিন্ন
অসামাজিক কাজে
জড়িত হয়ে পড়লো। এরা সব সময়
চাইতো যে,পাকিস্তানি
আর্মি আসুক। আর্মির সঙ্গে
মিলে এরা হয়তো
এটাকে আরও অন্যভাবে
কাজে লাগিয়ে তাদের
স্বার্থ সিদ্ধি
করবে।
পাকিস্তানি আর্মি
বানারিপাড়ায় প্রথম
আসলো,বোধহয়
মে মাসে। এপ্রিলের শেষ
বা মে মাসের প্রথম। বানারিপাড়া
উঠে প্রথমে ওরা
বানারিপাড়া থেকে
রায়েরহাটের দিকে
গেলো। এই এলাকায়
আমি স্কুলের হেডমাস্টার
ছিলাম। এটা
হিন্দু অধ্যুষিত
এলাকা। ওখানে
পাকিস্তানিরা সমস্ত হিন্দুদের
ডেকে এক খালের
পারে নিয়ে যায়। এই সকল নিরীহ
মানুষ রাজনীতি
করতো না। এই সময় আমি এবং
আমার এক ছোট ভাই
বিমল কৃষ্ণ,পরে বিমল
কৃষ্ণ শহীদ হন
আমরা দু’জনে তখন ওদের পিছন
পিছন গিয়ে ঘটনা
লক্ষ্য করলাম। আমরা একটা
পেয়ারা বাগানের
ভিতর ছিলাম। একটা বড় খালের
ওপারে। দেখলাম
একসাথে প্রায় ৭০/৮০
জন লোককে পাকবাহিনী
হত্যা করলো ব্রাশ
ফায়ার করে। এরা সকলেই হিন্দু
ছিলো। এই সময়
মেয়েদের তারা হত্যা
করে নাই। শুধু পুরুষদের
হত্যা করেছিলো। এই হত্যার
দৃশ্য আমি প্রত্যক্ষ
করি। কিছুক্ষণ
পরে আমি এবং শহীদ
বিমল কৃষ্ণ ওখানে
গিয়ে দেখলাম যে,দু’চার জন লোক
তখনো আধমরা অবস্হায়
বেঁচে আছে। তার মধ্যে আমার
কয়েকজন ছাত্রও
ছিলো। আমি
ওদের কোনোরকমে
ঐ খালের ভিতর থেকে
উঠাই। উঠাবার
পরে একজন ছেলে
বেঁচে যায়। সে গাবার এক ব্যবসায়ীর
ছেলে। আমার
ছাত্র ছিলো। তখন ক্লাস
নাইনে পড়তো।
ঐ দিনই পাকিস্তানি
বাহিনী আটঘর কুরিয়ানা
আক্রমণ করে নাই। তারা গাবা
রামচন্দ্রপুর
ইউনিয়নের হোসেনপুর,ব্রাহ্মনের
হাট-এইসব অঞ্চলে
আক্রমণ করে চারদিক
থেকে। তারা
এলাকার সমস্ত হিন্দুকে মেরে
ফেলতে লাগলো। এই সঙ্গে হিন্দুদের
বাড়ি বা হিন্দুদের
পরিচয় জানার জন্য
তাদের কিছু দালাল
তারা সৃষ্টি করলো। দেখা গেলো
কিছু লোক মাথায়
টুপি দিয়ে ওদের
সঙ্গে মিলে সমস্ত হিন্দু বাড়িঘর
চিনিয়ে দিতে লাগলো। এরা লুটপাট
করলো বা আগুন দিয়ে
সব পুড়িয়ে দিলো। তখন আটঘর কুরিয়ানা
অঞ্চলে ছিলো সিরাজ
সিক্দারের দল। সর্বহারা পার্টি। ক্যাপ্টেন
বেগের নেতৃত্বে
ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের
আর একটি দল। ওরা ছিলো আটঘর
কুরিয়ানায়। বিমরুলিতে
ছিলো সর্বহারা। আমি ছিলাম
গাবা অঞ্চলে। আমরা ছিলাম
খুব দুর্বল শক্তি। খুব কমসংখ্যক
লোক ছিলো প্রথম
দিকে। প্রশিক্ষণ
এবং পরিকল্পনার
জন্য ওদের নিয়ে
ক্যাপ্টেন বেগ
চলে যান ভারতে। এরা ভারতে
চলে যাওয়ার পর
সিরাজ সিক্দার
বানারিপাড়ায় পাকিস্তানি
বাহিনীর বিরুদ্ধে
প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি
বাহিনী থানা থেকে
বের হয়ে বিভিন্ন
বাড়ি আক্রমণ করলো। মেয়েদের ধর্ষণ
করলো। বিভিন্ন
বাড়ি লুট করলো। ঐ দিনই আমার
নিজের বাড়ি লুট
হয়। আমার বাবার
উপরে অত্যাচার
করে। আমার বাবার
ঘরটাকে জ্বালিয়ে
দেয়। তাঁর সর্বস্ব
লুট করে নিয়ে যায়।
সিরাজ সিকদার
তখন এই এলাকায়
মতি নামে পরিচিত। সিরাজ সিকদার,সেলিম শাহনেওয়াজ
এখন সব বেঁচে নেই। নিজেদের দ্বন্দ্বে
ওদের মরতে হয়েছিলো
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। তাদের সঙ্গে
সম্মিলিতভাবে
মিলে আমরা বানারিপাড়া
থানা আক্রমণ করেছিলাম। সেদিন আমাদের
উদ্দেশ্য ছিলো
বানারিপাড়া থানা
আক্রমণের সঙ্গে
সঙ্গে ওখানে পিস
কমিটির মিটিং-য়ে
আমরা হানা দেবো। তখন থানার
পাশে সাহা বাড়িতে
পিস কমিটির মিটিং
হচ্ছিলো। কিন্তু এই কথাগুলি
কেমন করে যেন ফাঁস
হয়ে যায়। আমরা এখনও জানি
না এই রহস্যটা। আমরা যখন থানা
আক্রমণ করলাম তখন
থানা থেকে আমাদের
লক্ষ্য করে প্রতি
আক্রমণ করলো। আমাদের অস্ত্র যেহেতু তাদের
মতো ছিলো না,অ্যামুনিশন
খুব কম ছিলো,তাই আমরা
সেখান থেকে রিট্রিট
করি। এই আক্রমণে
দুইজন পুলিশ মারা
যায়। আমার অসিত্বকে সেদিনই
ওরা ধরতে পারলো। তারা জানলো
যে আমি একটা বিরাট
দল নিয়া এখানে
অ্যাকটিভ। ঐ রাতেই আমরা
আমাদের ক্যাম্প
থেকে যে ক্যাম্পটি বুড়ির বাড়ির
ক্যাম্প বলে পরিচিত
ছিলো সেই ক্যাম্প
থেকে স্পীডবোটে
সিরাজ সিকদারের
কাছে চলে যাই আটঘর
কুরিয়ানায় নিরাপদ
অঞ্চলে। আমরা জানতাম যে,আমাদের ক্যাম্প
আক্রান্ত হবে কালকেই। তখন আমার দলের
একটা গোয়েন্দা
গ্রুপ ছিলো। তারা আমাকে
খবর দিয়েছিলো যে
পাকিস্তানিরা
রাত্রেই হয়তো আক্রমণ
করতে পারে। আমি সিরাজ সিকদারকে
এই কথাটা বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন
যে,
এক ডিভিশন
সৈন্য ছাড়া এতোবড়
অঞ্চলে তারা আক্রমণ
করতে পারবে না। কিন্তু দেখা
গেলো যে, রাত্র সাড়ে তিনটার
সময় আমরা যেখানে
ছিলাম তার চারিদিকে
অজস্র মানুষ এসে
গেছে। তাদের
একদল সহযোগী পেয়ারা
বাগান সাফ করতে
লাগলো। এক সময়
পেয়ারা বাগান সব
কেটে ফেললো। আখের খেত শেষ
করলো। সমস্ত জায়গা তখন একটা
উদাম বা খালি অঞ্চলে
পরিণত হলো। পেয়ারা বাগানের
দুই পাশে কতকগুলি
খাল ছিলো-যেখানে
দশ বারো হাত পানি
জমা থাকতো প্রায়
সব সময়। এই খালের
ভিতরে হাজার হাজার
মানুষ প্রাণের
ভয়ে লুকাতে চেষ্টা
করলো। এদিকে
শর্ষিনা পীর সাহেবের
মাদ্রাসার প্রায়
তিন থেকে সাড়ে
তিন হাজার ছাত্র
এবং চারিদিকের
ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের
সরবরাহকৃত অনেক
লোকজন নিয়া এই
অঞ্চলটাকে পাকিস্তানি
আর্মি ঘিরে ফেললো। অসংখ্য মানুষ
তারা হত্যা করলো। পাকিস্তানিরা
সেদিনই মেয়েদের
ধরলো,যারা
অল্প বয়সী মেয়ে
বা ৪৫ বছর পর্যন্ত বয়স তাদের ধরে
নিয়ে কুরিয়ানা
স্কুলে একটা ঘাঁটি
করলো। সেই
ঘাঁটিতে পাকিস্তানিরা
বেশ কয়েকদিন থাকে
এবং ধারাবাহিক
অত্যাচার করতে
থাকে। তারা
যাকে পায় তাকেই
হত্যা করে। লুটপাট করে। ঐ অঞ্চল তখন
এক বিরান ভূমিতে
পরিণত হলো। কয়েকদিন থাকার
পর পাকিস্তানি
আর্মি এখান থেকে
চলে যায়।
পাকিস্তানিরা
চলে যাওয়ার পর
কুরিয়ানা স্কুলের
পাশেই একটা বাড়িতে
আমরা যখন যাই তখন
দেখলাম অন্তত ৩৫
থেকে ৪০ জন মহিলাকে। ১২ থেকে ৪৫
বছর পর্যন্ত তাদের বয়স ছিলো। প্রত্যেকেই
তারা ধর্ষণের শিকার
হয়েছিলো। কিছু মেয়েকে তারা
সঙ্গে করে নিয়ে
যায়। আজ পর্যন্ত যাদের আর
খবর পাওয়া যায়
নাই। এখানে একটা
কথা বলে রাখা দরকার। এই হামলার
পরে সিরাজ সিকদারের
দল অন্যত্র চলে
যায়। একমাত্র
আমি এবং আমার কয়েক
জন ছেলে আমরা চলে
আসি আমার গাবা
অঞ্চলে। গাবা অঞ্চল তখন
বিরান ভূমি হয়ে
গেছে। আর্মিরা
সমস্ত জায়গায়
হত্যা লুন্ঠন করেছে। আস্তে আস্তে আবার
আমি ছেলেদের সংগঠিত
করতে শুরু করি। এর আগেই আমি
সংগঠন করেছিলাম
কয়েকজন ছেলেকে
নিয়ে। এরপরে
অবশ্য খুব শক্তিশালী
দল হিসাবে আমার
দল প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে অন্য
কোনো দল ছিলো না। আওয়ামী লীগের
নেতৃত্বে কোনো
দল ছিলো না। সর্বহারারাও
তখন ছিলো না। সর্বদলীয় একটি
দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ
ঘটে আমার দলের। এই দলে ভাসানী
ন্যাপ ছিলো। ন্যাপ মোজাফ্ফরের
দল ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টি
ও ছাত্র লীগ ছিলো। আওয়ামী লীগ
ছিলো। অন্যান্য
দল যারা প্রগতিশীল
রাজনীতি করতো তাদের
অনেকেই ছিলো এই
দলে। আমার মনে
পড়ে আমার সঙ্গে
ছিলেন কমিউনিস্ট
পার্টির সদস্য
এনায়েত ভাই। এনায়েত ভাইকে
এর দুই তিন দিন
পর আর্মিরা ধরে
নিয়ে যায়। এখনো পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ
পাওয়া যায়নি। এভাবেই সেই
যুদ্ধের দিনগুলোতে
আমরা লড়াই করেছি। আমাদের অঞ্চল
ছিলো খাল নালা
আর বড় নদী বেষ্টিত। পাকিস্তানি
আর্মি প্রায় প্রত্যেক
দিন আমাদের এখানে
গানবোট নিয়ে আসতো। আমাদের সঙ্গে
ওদের প্রায়ই সংঘর্ষ
হতো। তখন আমরা
শক্তিশালী একটি
দল হিসাবে সবার
নজরে এসেছি। তখন তো বেণুর
দল বা বেণুর বাহিনীর
নাম শুনলেই পাকিস্তানিদের
মধ্যে একটা আতঙ্ক
সৃষ্টি হতো। আমাদের যে
সমস্ত অস্ত্র ছিলো তার মধ্যে
সবচেয়ে অ্যাফেকটিভ
অস্ত্র ছিলো কতকগুলি
বোমা-যেটা ভারি
অস্ত্রের চেয়েও
অনেক সময় আমার
উপকারে এসেছিলো। শেষপর্যন্ত দেখা গেলো যে,পাকিস্তানি
আর্মি খুব বড় সংঘবদ্ধ
দল ছাড়া আমাদের
এই অঞ্চলে আর প্রবেশ
করে নাই।
এরপরে এই এলাকায়
আসলো বাংলাদেশ
সরকারের মুক্তিবাহিনী। এখানে সাব
সেক্টর কমান্ডার
করা হলো ক্যাপ্টেন
শাহজাহান ওমরকে। তিনি তখন বড়কোটায়
আসেন। তিনি
বড়কোটায় আসার পরে
আমাকে ক্লোজ করতে
বলা হলো। তিন চার দিন পরে
ক্যাপ্টেন ওমর
আমার ক্যামেঙ আসেন। তখন আলতা গ্রামের
জমিদার বাড়িতে
আমার ক্যামঙ ছিলো। ওখানে আসার
পরে তিনি আমাকে
কিছু অসপাতি দেন। হালকা অস্ত্র পাতি ছিলো
সেসব,যেটা
দিয়ে শক্তিশালী
পাকিস্তানি বাহিনীর
মোকাবিলা করা সম্ভব
ছিলো না। তবুও এই সকল অস্ত্র দিয়ে এবং নিজেদের
যে শক্তি সাহস
ছিলো তা দিয়ে প্রত্যেক
সপ্তাহে অন্তত
দশবার আমাকে পাকিস্তানি
বাহিনীর মোকাবিলা
করতে হতো বিভিন্ন
ফ্রন্টে এবং বিভিন্ন
জায়গায়। আমার নিয়ন্ত্রনে
ছিলো বানারিপাড়া
অঞ্চল,আটঘর কুরিয়ানা
ইউনিয়ন, স্বরূপকাঠি থানার
এবং উজিরপুর থানার
দুইটা ইউনিয়ন। গাবা রামচন্দ্রপুর
ইউনিয়ন ছিলো ঝালকাঠি
থানার। স্বরূপকাঠি
থানার আরেকটা এলাকা
আমার মধ্যে ছিলো। এই বিরাট এলাকাকে
বিভিন্নভাবে শক্তি
সঞ্চয় করে প্রতিদিন
আমাদেরকে পাকিস্তানি
বাহিনীর মোকাবিলা
করতে হয়েছিলো। ক্যাপ্টেন
ওমর আমার অস্তিত্ব
ও কার্যক্রম শেষপর্যন্ত মেনে নেন।
এর ভিতরে আমার
এলাকার অনেক ছেলে
ইন্ডিয়া চলে গেলো। ফ্রিডম ফাইটারের
ট্রেনিং নিলো তারা। ট্রেনিং নিয়ে
কিছু কিছু ছেলে
দেশে আসতে লাগলো। ক্যাপ্টেন
শাহজাহান ওমরের
কাছে ছিলো আমার
এলাকারই কিছু ছেলে,তাদেরকে
আমি ওখান থেকে
নিয়ে আসি। এর ফলে আমার শক্তি
আরো বৃদ্ধি পায়। আমার কোনো
ভারি অস্ত্র ছিলো না। আমি স্হানীয়ভাবে
কিছু বোমা তৈরি
করার চেষ্টা করলাম। যে অস আমাদের ছিলো
তাই দিয়ে আমরা
বানারিপাড়া থানা
দখল করলাম। থানা দখল করার
পর আবার আমরা মোটামুটিভাবে
প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম
এই কারণে যে,পাকিস্তানি বাহিনী
এবার নিশ্চিত ভাবেই
একটা বড় আক্রমণ
চালাবে। তিন চার দিন পর
পাকিস্তানি বাহিনী
আসলো। দুইটা
গানবোট তাদের সামনে
পিছনে ছিলো এবং
মাঝখানে এক বিরাট
স্টীল বডির লঞ্চ,যার ভিতরে
আর্মিরা ছিলো। আমরা স্বরূপকাঠি
থানা থেকে বানারিপাড়া
অঞ্চল পর্যন্ত খালের পারে,নদীর দুই
পারে বাঙ্কার এবং
ট্রেঞ্চ খুঁড়লাম। আমরা এই ব্যাপারে
নিশ্চিত ছিলাম
যে,আমরা হয়
লড়বো না হয় মরবো। আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ
হলাম যে পাকিস্তানিদের
আমরা এখানে উঠতে
দেবো না। এক বিরাট শক্তিশালী
পাকিস্তানি বাহিনীর
সাথে যুদ্ধ করার
জন্য আমি ক্যাপ্টেন
শাহজাহান ওমর সাহেবকে
বলেছিলাম যে, একটা মর্টার
এবং একটা রকেট
লাঞ্চার দিয়ে সাহায্য
করতে। আমি
ভেবেছিলাম অস্ত্র
পাবো এবং ওদের
প্রতিরোধ করতে
পারবো। তারা
এই এলাকায় আসতে
পারবে না। কিন্তু তিনি অঙ্গীকার
করেও আমাকে অস্ত্র সরবরাহ করেন নাই। আমি একটা গোলক
ধাঁধাঁয় ছিলাম। এটা একটা শুভঙ্করের
ফাঁকিই বলবো আজকে। স্বরূপকাঠি
থানার পর থেকেই
পাকিস্তানি বাহিনী
যখন আমাদের ওপর
আক্রমণ শুরু করলো,তখন আমি
আমার বাহিনী নিয়া
নদীর পার থেকে
পাল্টা আঘাত করি। পাকিস্তানি
বাহিনী এই সময়
ভয়ানক শেল বর্ষণ
শুরু করে। হেভি মেশিনগান
ব্যবহার করলো। আক্রমণ করতে
করতে পাকিস্তানিরা
চাউলাকাঠি পর্যন্ত চলে এলো। সব জায়গায় আমরা
ওদের প্রতিরোধ
করেছি। এখানে
আরও বলে রাখি,এ সময় আমাদের
মাথার উপর দিয়ে
কিছু প্লেনের আনাগোনা
টের পেলাম। মনে হয়,ওরা আর্মিদের
কভারিং-য়ের জন্য
বিমান ব্যবহার
করতে চাচ্ছিলো। চাউলাকাঠি
পর্যন্ত যাওয়ার পরে,ওরা যখন
আবার বিপরীত দিকে
অর্থাৎ বানারিপাড়া
থানার দিকে আসতে
লাগলো তখনও আমাদের
বাধার সম্মুখীন
হয় ওরা। কিন্তু
যেহেতু আমাদের
তেমন শক্তিশালী
অস্ত্র
ছিলো
না। তাই আমাদের
প্রতিরোধ উপেক্ষা
করেই পাকিস্তানি
বাহিনী বানারিপাড়া
থানায় চলে আসে। এই যুদ্ধে
আমাদের বেশ কিছু
সহযোদ্ধা আহত হয়
এবং শহীদও হন।
ঐ দিন দেলোয়ার
নামে আমাদের এক
মুক্তিযোদ্ধা
শহীদ হন। আরো অনেক অজানা
লোককে পাক বাহিনী
ধরে নিয়ে যায়। কিছু লোককে
মেরে ফেলে। তখন বেলা বোধহয়
তিনটা সাড়ে তিনটা
বাজে। তারা
বানারিপাড়া থানা
দখল করে নেয়। এই থানা আমাদের
দখলে ছিলো। তারা থানা হেডকোয়ার্টারে
ঢুকে বিভিন্ন বাড়িতে
লুটপাট করে। বানারিপাড়া
বন্দরে আগুন দেয়। প্রথমেই বন্দরে
আগুন দেয় তারা। মসজিদে আগুন
দেয়। আমরা জানতে
পারি যে, কিছু লোক তাদের
দোসর ছিলো। এরা স্হানীয় লোক। তারা তখন ইউনিয়ন
কাউন্সিলের সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট ছিলো। তারা বোরখা
পরে পাকিস্তানি
বাহিনীকে আমাদের
এলাকায় গাইড করে
নিয়ে আসে। থানার পূর্ব পাশে
একটা ব্রিজ ছিলো। দক্ষিণ পারে
বন্দর। এটার
পাশেই এক সাহা
বাড়ির সাথে খালের
পারে লঞ্চে ওরা
রাতে থাকে। বানারিপাড়া বন্দর
বিরাট বন্দর। চারদিকে আগুন
দাউ দাউ করে জ্বলছিলো। ঐদিন রাতে
আমি এবং আমার যে
ফিল্ড কমান্ডার
ছিলো আবদুল কাদের,উনি বেঙ্গল
রেজিমেন্টে চাকরি
করতেন, আমরা দুইজনে দুইটা
এল. এম. জি. নিয়া ফায়ার
করি লঞ্চ লক্ষ
করে। তখন রাত্রিবেলা। পাকিস্তানিরা
খুব উল্লাস করছিলো
লঞ্চে বসে। কারণ ওরা মনে করছে
যে,এটা মুক্তিবাহিনী
মুক্ত অঞ্চল। ফায়ার করার
পরে আমরা টের পেলাম
যে একটা ভীষণ আলোড়ন
চলছে লঞ্চের ভিতরে। আমাদের সাথে
ওদের প্রায় বিশ
মিনিট গোলাগুলি
হয় এবং আমরা ওখানে
কয়েক’শ রাউন্ড
বুলেট খরচ করি। ওরা সেই রাতেই
চলে যায় বানারিপাড়া
ত্যাগ করে। বরিশাল থেকে আমাদের
কাছে খবর আসলো
যে,ওদের বহু
লোককে বরিশাল হাসপাতালে
ভর্তি করা হয়েছে। আরো খবর আসলো
যে অন্তত: ৩৫ থেকে
৩৬ জন পাকিস্তানি
সেনা ঐদিন মারা
যায় আমাদের এল.এম.জি.র
গুলির আঘাতে। তাদের কয়েকটা
লাশও পাওয়া যায়। পাকিস্তানি
বাহিনী চলে যাওয়ার
পর আমরা আবার বানারিপাড়া
থানা দখল করে নেই। আমরা থানা
দখল করার পরে ওরা
আর কোনোদিন এখানে
আসে নাই। আমরা মুক্ত অঞ্চল
হিসাবে বানারিপাড়াতে
অবস্হান করতাম।
এরপর থেকে আমি
বিভিন্ন অঞ্চলে
ওদের সঙ্গে যুদ্ধ
করেছি। এক দিন
ওরা জম্ভু দ্বীপের
মুখে গানবোট নিয়ে
আমাকে আক্রমণ করে। আমার তখন খুব
হালকা অস্ত্র ছিলো। আমার
সাথে ছিলো বারো
তের জন। গানবোটটি
আমরা আক্রমণ করে
তাড়াই। সেই
গানবোটটি আমাদের
তাড়া খেয়ে একসময়
দেখা গেলো কাউখালি
হয়ে স্বরূপকাঠি
গেলো। এই গানবোটটির
নাম ছিলো সম্ভবত:
জাহাঙ্গীর বাহাদুর। কিন্তু শেখেরহাটে
ক্যাপ্টেন শাহজাহান
ওমর ঐ বোটটাকে
ডুবিয়ে দেয়। এর প্রতিশোধ
হিসাবে পাকিস্তানিরা
গাবখানে এক বিরাট
হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিলো। এরপরে তারা
তেমন আর এদিকে
আসে নাই। তখন যুদ্ধের শেষ
পর্যায়।
এর আগের কিছু ঘটনা
বলি। রাজাকার
এবং পুলিশ বাহিনী
আমাদের সবচেয়ে
বেশি ক্ষতি করতো। সাথে এখানকার
স্হানীয় দোসররা। একবার রাজাকার
ধরার কারণে ওদের
মুক্তির বিনিময়ে
আমার বাবাকে ওরা
ধরে নিয়ে যায়। পিরোজপুর থেকে
আর্মির এক অফিসার
আসে। ঐ অফিসার
আমার বাবাকে অনেক
অনুরোধ করে বলেন,যেন আমি
রাজাকারদের ছেড়ে
দিই। আমার বাবা
এতে রাজি হন নাই। শেষপর্যন্ত তৎকালীন যে
থানা প্রশাসন এবং
স্হানীয় যে দালাল
তারা আমার বাবাকে
ছেড়ে দেয়। আমরা এই ঘটনার
পর রাজাকারদের
মধ্যে তিন জনকে
মেরে ফেলেছিলাম
যারা খুব খারাপ
কাজে যুক্ত ছিলো। রাজাকাররা
আমাদের কাছে বললো
এবং লিখিত দিলো
যে,তাদের চারজনকে
চেয়ারম্যানই বাধ্য
করেছিলো রাজাকারে
নাম লেখাবার জন্য। আমি সব সময়
আমার ক্যাম্প থেকে অপারেশনে
নেতৃত্ব দিতাম। শোনা যায় যে,আমার ফটো
বিভিন্ন জায়গায়
আঁকিয়ে ওরা প্রচার
করেছিলো। বিশ হাজার টাকা
পুরস্কারও ঘোষণা
করেছিল আমাকে দেখিয়ে
দেয়ার জন্য। তাই আমাকে
ধরার জন্য বিভিন্ন
প্রক্রিয়া চলে। একদিন আলতায়
আমার এক বন্ধুর
বাড়িতে রাতে খাওয়ার
জন্য গিয়েছিলাম। তার পরের দিনই
আর্মি ব্যাপক আক্রমণ
করে আলতা গ্রামটাকে
জ্বালিয়ে দেয়। আর্মি আমাকে
ধরার জন্য বহু
চেষ্টা করে। কিন্ত আমাকে
ধরতে পারে নাই। আমি আগের রাত্রেই
চলে এসেছিলাম। তখন আমাদের
দলের প্রধান কর্তব্য
ছিলো এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে
আনা। শান্তি শৃক্মখলা
ফিরিয়ে আনতে গিয়ে
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর
দোসরদের সঙ্গে
আমার অনেক সময়
সংঘর্ষ হয়। থানার রাজাকাররা
তখন শেষ হয়ে গেছে। আমার এলাকা
তখন মুক্ত অঞ্চল।
এরপরে আমরা বরিশাল
শহরে চলে যাই। বরিশাল দখলের
জন্য যে যুদ্ধ
চলছিলো আমার বাহিনী
তাতে সক্রিয় ভূমিকা
নেয়। তখন আমার
ক্যাম্প ছিলো বরিশাল
মহিলা কলেজ হোস্টেলে। যেটা চাঁদ
শীলের বাড়ি ছিলো। কুরিয়ানা আটঘরে
পাকিস্তানি বাহিনীর
আক্রমণে যে বিরাট
হত্যাকান্ড সংঘটিত
হয়-এর জন্য সম্পূর্ণ
আমি দায়ী করবো
শর্ষীনার পীর সাহেবকে। তার নেতৃত্বে
হাজার হাজার রাজাকার,মাদ্রাসার
ছাত্ররা আর্মির
সঙ্গে কাঁধে কাঁধ
মিলিয়ে আমাদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ
করেছিলো। আজ পর্যন্ত ঐ আটঘর কুরিয়ানা
এবং ৩৭টা বিল এলাকার
গ্রামে আর্মি বা
তাদের দোসররা যে
কতো মানুষকে হত্যা
করেছে তার হিসাব
আমরা পাইনি। সবচেয়ে দুঃখ
হয় আজকে ২৫ বছর
পরেও সেই অঞ্চলে
কোনো ত্রাণ পুনর্বাসনের
ব্যবস্হা করা হয়
নাই। এই ম্যাসাকারের
মধ্যেও আমার দল
ত্রাণ কাজে নিয়োজিত
ছিলো। বিভিন্ন
জায়গা থেকে আমরা
লুটের মালপত্র
উদ্ধার করে খাবার,কাপড়-চোপড়,ঔষুধের ব্যবস্হা
ঐসব অঞ্চলে করি। আমি বিভিন্ন
সময়ে বিভিন্ন হাটে
গিয়ে,বাজারে
গিয়ে মানুষের কাছ
থেকে টাকা,কাপড়-চোপড়
এবং ঔষুধ সংগ্রহ
করে বিলি ব্যবস্হা
করি। স্বাধীনতার
যুদ্ধ কেবল অস্ত্র দিয়ে করি
নাই আমরা। এর সঙ্গে সঙ্গে
দেশের মানুষকে
ত্রাণ পুনর্বাসন
এবং তাদের খাবার
জোগাড় করেছি। তাদের নিরাপত্তার
ব্যবস্হা করেছি। বরিশাল দখল
করার পরে কার্যত
আমাদের কর্মকান্ড
শেষ হয়ে যায়। আমাদের ধারণা
ছিলো,আশা
ছিলো যে,আমরা হয়তো আমাদের
যারা শ্রমিক,কৃষক,বিভিন্ন
স্তর থেকে বিভিন্ন
লেবেল থেকে যারা
মুক্তিবাহিনীতে
এসেছে,স্বাধীনতা যুদ্ধ
করেছে,তাদের হয়তো কোনো
ব্যবস্হা হবে। যার ফলে ভবিষ্যতে
তারা অন্তত: ছেলেপেলে
নিয়ে শান্তিতে
বসবাস করতে পারবে
বা তাদের পেটের
খাবার জোগাড় করার
একটা ব্যবস্হা
হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য
তা আর হয়নি।
আমি পিরোজপুরে
অস্ত্র জমা দিলাম। পিরোজপুর তখন
সাবডিভিশন ছিলো। সাবডিভিশনে
সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমি জমা দেই। ১ লাখ ৫২ হাজার
অ্যামুনেশন
আমি জমা দেই। আমার দলের
অনেক ছেলেকে তখন
মিলিশিয়া বাহিনীতে
ভর্তি করানো হয়। কিন্তু কিছু
দিন পর দেখা গেলো
সরকার মিলিশিয়া
ভেঙে দিলো। এই লোকগুলি তখন
হতাশায় ভুগছিলো। এদের এই হতাশাটাই
শেষ পর্যন্ত এদের মধ্যে
বিভিন্নমুখী মনোভাবের
সৃষ্টি করে। আজকে ২৫ বছর
পরেও তারা দাঁড়াতে
পারেনি। কেউ রিকশা চালায়। অনেক লোক পঙ্গু
হয়ে গেছে। তাদের কোনো ব্যবস্হা
করা হয় নাই। এই জন্য আমি নিজেকেও
দায়ী করি। তেমনি তৎকালীন যে
ব্যবস্হা তৎকালীন যে
প্রশাসন তারা হয়তো
এ জন্য দায়ী। তারা বিষয়টি
নিয়ে গভীরভাবে
চিন্তা করেন নাই। কিন্তু এখন
একটা সময় আসছে। মুক্তিযোদ্ধাদের
এখন অন্তত: পুনর্বাসনের
ব্যবস্হা করা দরকার
বলে আমার মনে হয়।
প্র:
আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করলেন
?
উ: তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তানের এবং
বাংলাদেশের সচেতন
নাগরিক হিসাবে,একজন রাজনৈতিক
সচেতন ব্যক্তি
হিসাবে আমার একটা
দায়িত্ব ছিলো। একটা নৈতিক
দায়িত্ব ছিলো দেশের
স্বাধীনতার জন্য
যুদ্ধে অংশগ্রহণ
করা। দেশকে মুক্ত
করার অঙ্গীকার
আমাদের তখন ছিলো। সেটাকে পরিপূর্ণ
রূপ দিতেই আমি
মুক্তিযুদ্ধে
অংশগ্রহণ করেছিলাম। দেশের মানুষের
মুক্তির জন্য লড়াই
করেছিলাম।
প্র:
আপনার এলাকা কখন
পাকিস্তানিরা
আক্রমণ করলো এবং
কিভাবে আক্রমণ
করলো ?
উ: আমার এলাকা
বানারিপাড়া থানায়
তারা প্রথম আসে
১৯৭১-এর মে মাসে। থানা হয়ে তারা
বিভিন্ন দলে বিভক্ত
হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে
পড়ে। দেখা গেল,বাগপুর অঞ্চলে
এক দল গেলো। এক দল গেলো রায়েরহাটের
দিকে বানারিপাড়া
থানা হয়ে। রায়েরহাট থেকে
এক দল গেলো বরিশালের
রাসায়। এই দল গেলো
নারায়ণপুর পর্যন্ত। এক দল গেলো
গাবার দিকে,আমার স্কুল
যেখানে অবস্হিত
ছিলো। ঐ অঞ্চলে
চার পাঁচটা দলে
তারা বিভক্ত হয়ে
আক্রমণ করলো। বহু মানুষকে
তারা হত্যা করেছিলো। বহু বাড়িঘরে
তারা আগুন দিয়েছিলো
এবং ওদের সাথে
স্হানীয় যে দোসররা,দুষ্কৃতিকারীরা
ছিলো-তারা সঙ্গে
সঙ্গে মালামাল
লুটপাট করে এবং
মেয়েদের পাকিস্তানি
বাহিনীর হাতে তুলে
দেয়। মেয়েদের
তারা নিয়ে যায়। তখন বিশেষ
করে তারা হিন্দুদের
ওপর আক্রমণ করে। প্রায় দেখা
গেছে,এরা
নদীর পারে এবং
খালের পারে হতভাগ্যদের
এক সারিতে দাঁড়
করিয়ে ব্রাশফায়ারে
হত্যা করে। পাকিস্তানিরা
সকালে আসতো এবং
সন্ধ্যার মধ্যে
ফিরে যেতো। ওরা বিকেল চারটা
পাঁচটার পরে গ্রাম
অঞ্চলে থাকতো না। থানায় এসে
তারা আশ্রয় নিতো। থানা থেকে
তারা বিভিন্ন দলে
বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন
এলাকায় চলে যেতো। হত্যা,লুটপাট আগুন
জ্বালানো-এগুলি
তারা করতো নিত্য
দিন।
প্র:
আপনার এলাকায় কখন
থেকে মুক্তিবাহিনীর
তৎপরতা শুরু হয় ? তখন মুক্তিবাহিনী
সমঙর্কে জনগণের
মনোভাব কেমন ছিলো
?
উ: মে মাসে
আমার এলাকা পাকিস্তানি
বাহিনীর হাতে পতনের
পর থেকে আমি মুক্তিবাহিনী
গড়ার চেষ্টা করি। অল্প কয়েকজন
সদস্য এবং কিছু
অস্ত্র নিয়ে এটা শুরু
করি। প্রথম দিকে
আমরা লুটপাট বন্ধ
করি এবং যারা লুটেরা
তাদের বাড়িঘর আক্রমণ
করি। অনেক ক্ষেত্রে
তাদের বাড়িঘর আমরা
পুড়িয়ে দেই। এই লুটেরা
বাহিনী সম্পর্কে জনগণের
একটা ঘৃণা ছিলো। এরা পাকিস্তানি
সেনাবাহিনীর চেয়ে
আরো মারাত্মক,ক্ষতিকারক
ছিলো। আমরা
লুটের মাল কিছু
কিছু উদ্ধার করে
আবার ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে
বিলি করে দেই। এলাকার জনগণ
মুক্তিবাহিনীকে
তাদের নিজস্ব লোক
এবং তাদের মুক্তিদাতা
হিসাবে মনে করতে
লাগলো। তারা
জানলো যে,আমাদের শক্তি
কম হলেও অন্তত:
স্হানীয় দোসরদের
থেকে আমরা তাদের
বাঁচাতে পারবো। আস্তে আস্তে যখন
আমাদের শক্তি বৃদ্ধি
পেতে লাগলো তখন
তারা এ সমঙর্কে
নিঃসন্দেহ হলো
যে আমরা স্বাধীনতার
জন্য যুদ্ধ করছি
এবং বাংলাদেশ একদিন
মুক্ত হবেই।
প্র:
আপনার গ্রাম বা
এলাকায় কারা রাজাকার
ছিলো,শান্তি কমিটিতে কারা
ছিলো ?
উ: আমার এলাকায়
রাজাকার ছিলো কৃষিকাজের
সঙ্গে যুক্ত কিছু
লোক কিছু ব্যবসায়ী
ছিলো, ক্ষুদ্র
ব্যবসায়ী কিছু
অল্প শিক্ষিত বা
বেকার তরুণ-এরাই
বেশি সংখ্যায় রাজাকার
ছিলো। শান্তি
কমিটির চেয়ারম্যান
প্রথম যে হয় তার
বাড়ি চাখার। শেরে বাংলা
এ. কে ফজলুল হকের
পাশপাশি তার বাড়ি। নাম আলী মিয়া। সে এখানে প্রথম
শান্তি কমিটি গঠন করে। বানারিপাড়া
থানা শান্তি কমিটির উনি চেয়ারম্যান
ছিলেন। কিছুদিন
পরে যখন আমাদের
তৎপরতা বৃদ্ধি পায়
তখন এখান থেকে
তিনি চলে যান। এরপরে ছিলেন
রজ্জব আলী মিয়া। উনি শান্তি কমিটি লিড
করতেন। আমরা
যখন বানারিপাড়া
থানা আক্রমণ এবং
দখল করি-তখন উনাকে
আমরা ধরে ফেলি। উনাকে মুক্তিযোদ্ধারা
হত্যা করে। আমার এলাকায় রাজাকারদের
যে নেতা ছিলো তার
নাম ছিলো আবদুল
আজিজ। কমান্ডার
আবদুল আজিজ। এরা স্বাধীনতার
পর বিভিন্ন জায়গায়
সরে যায়। এলাকায় অনেকেই
এখন নাই। বিভিন্ন জায়গায়
তারা বসবাস করছে।
প্র:
এ সকল স্বাধীনতা
বিরোধীদের ধরা
হয়েছিলো কি ?
উ: স্বাধীনতা
বিরোধীদের অনেককেই
আমরা ধরে দিয়েছিলাম। তাদের অনেককেই
কারাগারে নিক্ষেপ
করা হয়েছিলো। পর দেখা গেলো
বাংলাদেশ সরকারের
সাধারণ ক্ষমায়
তাদের অনেকেই ছাড়া
পেয়ে গেছে। এই ছাড়া পাওয়ার
পর তারা আমাদের
বিরুদ্ধে বিভিন্ন
সময় প্রতিশোধ নিতে
শুরু করলো। প্রশাসনকে হাতে
নিয়ে স্বাধীনতা
বিরোধীরা স্বাধীনতার
স্বপক্ষ শক্তি
এবং যারা মুক্তিযুদ্ধ
করেছিলো তাদের
বিরুদ্ধে বিভিন্ন
রকমের ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। যার ফলে বহু
মুক্তিযোদ্ধা
তাদের হাতে নিগৃহীত,নানা হয়রানি
আর নির্যাতনের
শিকার হয়। সাধারণ ক্ষমা
যদি না হতো,তাহলে বোধহয়
আজকে এই অবস্হাটার সৃষ্টি
হতো না।
প্র:
যুদ্ধের শেষে কি
অবস্হা দেখলেন-আপনার
গ্রামের বা এলাকার
স্কুল,কলেজ,মসজিদ, মাদ্রাসা,মন্দির,ব্রিজ ও
বাড়িঘরের অবস্হা ?
উ: যুদ্ধের
শেষে আমরা গ্রামে
এসে দেখলাম যে,গ্রামের
স্কুলগুলির শোচনীয়
অবস্হা। এখানে ছাত্ররা
নয় মাস কোনো লেখাপড়া
করতে পারেনি। কারণ কখন পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ
করবে তার ঠিক ছিলো
না। আর্মিদের
ভয়ে কেউ স্কুলে
যেতো না। অনেক শিক্ষক নিহত
হয়েছিলেন। অনেক ছাত্রকেও
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী
হত্যা করে। স্কুলগুলি জ্বালিয়ে
দেয়। আমার এলাকায়
একটা কলেজ ছিলো
তখন। চাখার ফজলুল
হক কলেজ। এই ফজলুল হক কলেজের
প্রশাসন থেকে বিভিন্ন
সময় সামরিক বা
পাক সেনাবাহিনীকে
মদদ এবং অনেক সময়
তাদের আশ্রয় দিয়েছিলো। কলেজের যারা
তখন শিক্ষক ছিলেন
তাদের বিরুদ্ধে
আমাদের অভিযোগ
ছিলো। তারা
কলেজে আর্মিদের
প্রবেশাধিকার
দেয়। আর্মিদের
সঙ্গে তাদের সম্পর্কও ছিলো
মধুর। মন্দিরগুলি
তারা ভেঙে দেয়। মন্দির,মঠ,আমার বাড়ি,আমার পারিবারিক
যে কতকগুলি বড়
মন্দির ও মঠ ছিলো
সেগুলির সমস্ত ওরা গুড়িয়ে
দেয়। স্হানীয় দোসররা
এর সুযোগ নেয় বেশি
করে। ব্রিজ,বাড়িঘর-অধিকাংশই
পুড়িয়ে দেয়। তখন আমার অঞ্চলে
বহু ব্রিজ ছিলো। আমরা নিজেরাও
কিছু ব্রিজ উড়িয়ে
দেই যাতে পাকিস্তানি বাহিনী
অগ্রসর হতে না
পারে। আবার
বিভিন্ন সময়ে ব্রিজ
না হলেও পুলগুলি
নষ্ট করে ফেলি। এর ফলে পাক
সেনাবাহিনী ঐ অঞ্চলে
হঠাৎ করে বিরাট আক্রমণ
করতে পারেনি। প্রতিটি হিন্দু
এলাকায় কোনো মন্দির
বা দেবতাদের বিগ্রহ-এগুলি
ছিলো না। এগুলি ভেঙে নিয়ে
যায়। মন্দির ধ্বংস
করে ফেলে। হিন্দু বাড়ির
উপরেই ওদের বেশি
আক্রোশ ছিলো। বসুত আমার এলাকার
হিন্দু বাড়ির শতকরা
নব্বই ভাগই পাকিস্তানিরা ধ্বংস
করে দেয়।
প্র:
কোন্কোন্এলাকায়
ব্যাপক হত্যাকান্ড,অগ্নিসংযোগ,লুটপাট হয়েছে
?
উ: গাবা,রামচন্দ্রপুর
ইউনিয়ন,স্বরূপকাঠি থানার
আটঘর কুরিয়ানা,উজিরপুর
থানার ঘুইট্টা
ইউনিয়ন এবং বানারিপাড়া
পুরো থানা এলাকা। বিশেষ করে
আটঘর কুরিয়ানায়
ব্যাপক হত্যাকান্ড, অগ্নিসংযোগ,লুটপাট হয়েছিলো। এতে পাক সেনাবাহিনী,তাদের দোসর
রাজাকার এবং বিশেষ
করে শর্ষীনা পীর
সাহেবের যে মাদ্রাসা
তাতে হাজার তিনেক
ছাত্র ছিলো-এসব
ছাত্র ওদের সহযোগী
হিসাবে লুটপাট,অগ্নিসংযোগ,হত্যাকান্ড
এবং ধর্ষণের মতো
কর্মকান্ডে যুক্ত
ছিলো সরাসরি।
প্র:
যুদ্ধ করতে গিয়ে
আপনার দলের কে
কোথায় শহীদ হয়েছেন
?
উ: আমার এলাকায়
যুদ্ধ করতে গিয়ে
কাজী মতিউর রহমান
শহীদ হয়েছিলো শর্ষীনা
পীর সাহেবের বাড়িতে। বানারিপাড়ায়
যুদ্ধ করতে গিয়ে
পাক সেনাবাহিনীর
হাতে শহীদ হন দেলোয়ার
হোসেন। আরোও
কিছু ছিলো। রাজাপুরের আবদুস
শহীদ হয় বানারিপাড়া
থানা আক্রমণের
সময়। বিমলকৃষ্ণ
দাশ,সে বাবুগঞ্জে
শহীদ হয়। রাজ্জাকপুরের
জাফর শহীদ হয় বরিশালের
কাছে।
প্র:
এই এলাকায় কার
নেতৃত্বে কয়টি
মুক্তিযোদ্ধা
গ্রুপ ছিলো ? ঐ গ্রুপে
কারা ছিলেন ?
উ: আমার বানারিপাড়া
থানায় বেস্কমান্ডার
আমি ছিলাম। আমার দলকে বিভক্ত
করি কয়েকটি সেক্শনে। ঐ সেক্শন
কমান্ডার ছিলো
আবদুর রশীদ,কাজী মতিউর
রহমান,কেশবচন্দ্র দাশ, হাসান আলী,মোসলেম খান
প্রমুখ।
প্র:
যুদ্ধ চলাকালে
বানারিপাড়া থানা
এলাকায় কোথায় কোথায়
আপনাদের মুক্তিযোদ্ধাদের
ক্যামঙ ছিলো?
উ: বানারিপাড়া
থানায় আমার মুক্তিযোদ্ধা
ক্যাম্প ছিলো। গাবায়,বুড়ির বাড়ি
নামে খ্যাত,সেখানে ক্যাম্প ছিলো। গাবা স্কুলে হেডমাস্টারের
কোয়ার্টারে ক্যাম্প ছিলো। স্বরূপকাঠি থানার
নরেরকাঠিতে ক্যাম্প ছিলো। বানারিপাড়ায়
বড় বণিকের বাড়িতে
ক্যাম্প ছিলো।
প্র:
বানারিপাড়ার কোথায়
কোথায় রাজাকার
বা শান্তি কমিটির ক্যাম্প অথবা অফিস
ছিলো ?
উ: বানারিপাড়া
থানায় রাজাকারদের
প্রধান ঘাঁটি ছিলো
বানারিপাড়া থানা
এবং থানা সংলগ্ন
সাহা বাড়ি ও বণিক
বাড়িতে।
প্র:
যুদ্ধ চলাকালে
বানারিপাড়া থানা
প্রশাসনের কি ভূমিকা
ছিলো ?
উ: বানারিপাড়া
থানা প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে আমাদের
বিরোধিতা করেছিলো। বিশেষ করে
পুলিশ প্রশাসন। তারা মুক্তিযুদ্ধের
সম্পূর্ণ বিরোধিতা
করেছিলো। তারা জুলুম অত্যাচার
করেছিলো এবং তারা
বহু লোককে হত্যা
করেছিলো। বহু বাড়িতে আগুন
দিয়েছিলো। আমার বাড়িতেও
তারাই আগুন দিয়েছিলো
এবং বহু লুটপাট
তারাই ঘটিয়েছিলো। থানা প্রশাসনে
যারা পুলিশ বা
পুলিশ অফিসার ছিলো-তাদের
অধিকাংশই বহু মেয়েকে
ধর্ষণ করেছিলো।
প্র:
বানারিপাড়া এলাকায়
কতো সংখ্যক নারীর
উপর অত্যাচার হয়েছে
বলে আপনার ধারণা
?
উ: আমার
জানা মতে আটঘর
কুরিয়ানায় অন্তত ছয় থেকে
সাত’শ মেয়ে
ধর্ষিত হয়েছিলো। এ ছাড়া বানারিপাড়া
অঞ্চলেও অন্তত: ২৫ থেকে ৫০
জনের মতো নারী
ধর্ষিত হয়েছিলো।
প্র:
আপনার এলাকায় কতো
সংখ্যক বাড়িঘরে
লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ
করা হয়েছিলো। হত্যার সংখ্যায়
বা কতো ?
উ: গাবা রামচন্দ্রপুর
ইউনিয়ন,আটঘর কুরিয়ানা
ইউনিয়ন,ঘুইট্টা ইউনিয়ন
এবং বানারিপাড়া
পুরো থানা-সব মিলে,বিশেষ করে
হিন্দু বাড়ির শতকরা
নব্বুই ভাগ লুটপাট
এবং অগ্নিসংযোগ
করা হয়েছিলো। আমার ধারণা
ঐ অঞ্চলে অন্তত: পঞ্চাশ হাজার
মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর
হাতে নিহত হয়।
প্র:
যুদ্ধের শেষে আপনি
কি করলেন ?
উ: যুদ্ধের
শেষে আমি আবার
আমার স্কুলে যোগদান
করি। হেডমাস্টার
হিসাবে আমি ১৯৭৪
সাল পর্যন্ত গাবা স্কুলে
ছিলাম। তারপর
আমি ১৯৭৯ সালে
মেঘনা পেট্টোলিয়াম
লিমিটেডে একজন
ডিপো সুপারিনটেনডেন্ট
হিসাবে চাকরি গ্রহণ
করি। এখন পর্যন্ত মেঘনা পেট্রোলিয়ামে
আমি চাকরিরত আছি। এখন আমি সিনিয়র
সেল্স অফিসার
হিসাবে চট্টগ্রামে
কর্মরত।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী
নাম : নিরঞ্জন দাশগুপ্ত
অনু
সাক্ষাৎকার গ্রহণের
তারিখ : অগাস্ট
১০,
১৯৯৬